
চেন্নাই, ২৩ এপ্রিল (হি.স.): তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে এবারের ভোট এক নতুন ইতিহাস তৈরি করল। স্বাধীনতার পর এই প্রথমবার রাজ্যে ভোটদানের হার পৌঁছাল ৮৪.৬৯ শতাংশে, যা নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ রেকর্ড। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পাওয়া পরিসংখ্যানে এই হার ৮৪.২৯ থেকে ৮৪.৬৯ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। কিছু বুথের চূড়ান্ত রিপোর্ট এখনও আসা বাকি থাকায় শেষ মুহূর্তে এই হার আরও সামান্য বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজ্যের মোট ৫.৭৩ কোটি ভোটার ২৩৪টি বিধানসভা আসনের জন্য ৪,০২৩ জন প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন। সকাল থেকেই রাজ্যজুড়ে ভোটকেন্দ্রগুলিতে নজিরবিহীন উৎসাহ দেখা যায়। প্রবল গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া উপেক্ষা করেও বিভিন্ন বুথে দীর্ঘ লাইন ছিল চোখে পড়ার মতো।
নির্বাচন কমিশনের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, কিছু বুথের তথ্য এখনও আসা বাকি রয়েছে, ফলে ভোটের হার আরও সামান্য বাড়তে পারে। এ বিষয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার জানিয়েছেন, “স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুতে সর্বোচ্চ ভোটদানের হার রেকর্ড হয়েছে। কমিশন পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে।”
ধাপে ধাপে ভোটদানের রেকর্ড বৃদ্ধি
ভোটগ্রহণ শুরু হয় সকাল ৭টা থেকে। প্রথম দুই ঘণ্টার মধ্যেই ১৭.৬৯ শতাংশ ভোট পড়ে, যা দ্রুত গতির অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দেয়। দুপুর ১টার মধ্যে ভোটদানের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৬.৮১ শতাংশে। বিকেল ৩টার মধ্যে তা প্রায় ৭০ শতাংশ ছুঁয়ে ফেলে এবং বিকেল ৫টার মধ্যে ৮২.২৪ শতাংশে পৌঁছে যায়। এরপর সন্ধ্যা নাগাদ চূড়ান্ত হার ৮৪ শতাংশের ওপরে গিয়ে ইতিহাস গড়ে।
জেলা ভিত্তিক ভোটদানে চমক
জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে নামাক্কলে (৮৭.৬৩%), এরপর সালেম (৮৮%), ইরোড (৮৭.৫৯%), ধর্মপুরী (৮৭.২৮%), ডিন্ডিগুল (৮৬.৩৫%) এবং তিরুপ্পুর (৮৬.৩৩%)। রানিপেট, ভেল্লোর ও তিরুপত্তুরেও ভোটের হার ৮৫ শতাংশের ওপরে।
কারুর জেলায় সর্বোচ্চ ৯২.০৪ শতাংশ ভোট পড়ে নজির তৈরি করেছে। চেন্নাই শহরেও ভোটদানের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৩.২১ শতাংশ, যা শহরাঞ্চলের ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রমাণ।
নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, পুরো ভোটপ্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। চেন্নাই শহরে ২৮ হাজারের বেশি পুলিশ ও হোম গার্ড মোতায়েন করা হয়। প্রশাসনের তরফে ভোটারদের নিরাপত্তা, পরিবহন ও বুথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
বিশেষভাবে সক্ষম ভোটারদের জন্য আলাদা বুথ, হুইলচেয়ার সহায়তা এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিক ব্যবস্থা রাখা হয়, যা ভোটকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলে।
রাজনৈতিক লড়াই: দুই জোটের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা
এই নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ডিএমকে নেতৃত্বাধীন সেক্যুলার প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স এবং এআইএডিএমকে-বিজেপি জোটের মধ্যে।
মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন নিজের সরকারের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার লড়াইয়ে রয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন ডিএমকে কংগ্রেসসহ একাধিক শরিক নিয়ে নির্বাচনে নেমেছে।
অন্যদিকে এআইএডিএমকে নেতা এডাপ্পাডি কে পালানিস্বামী পাঁচ বছর পর আবার ক্ষমতায় ফেরার লক্ষ্য নিয়ে প্রচারে ছিলেন। বিজেপির সঙ্গে পুনরায় জোট গঠন করে তারা শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে।
তৃতীয় শক্তি হিসেবে টিভিকে ও বিজয়
অভিনেতা-রাজনীতিক থলপতি বিজয়ের দল ‘তামিলাগা ভেট্রি কাজাগম’ (টিভিকে) এই প্রথমবার পূর্ণাঙ্গভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ২৩৪টি আসনেই প্রার্থী দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, টিভিকে-র প্রবেশ রাজ্যের ভোট সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিজয় ভোটের সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনে আবেদনও করেন, পাশাপাশি পরিবহন সমস্যার অভিযোগও তোলে দলটি।
তারকা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ভোটদান
এই নির্বাচনে তারকা ও রাজনীতিবিদদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন, উদয়নিধি স্ট্যালিন, এআইএডিএমকে নেতা পালানিস্বামী, পি চিদম্বরম, এল মুরুগনসহ বহু নেতা ভোট দেন।
তারকা জগতে রজনীকান্ত, ধনুশ, সূরিয়া, জ্যোতিকা, তৃষা, কমল হাসানসহ অনেকেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ভোট দিয়ে রজনীকান্ত বলেন, গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালন করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য।
মানবিক ও ব্যতিক্রমী ঘটনা
কাঞ্চিপুরমে এক নবদম্পতি বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করেই সরাসরি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে বিয়ের পোশাকেই ভোট দেন, যা গণতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধতার অনন্য উদাহরণ হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে।
অভিযোগ ও রাজনৈতিক চাপানউতোর
ভোট চলাকালীন টিভিকে দল পরিবহন সমস্যা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানায় এবং ভোটের সময়সীমা দুই ঘণ্টা বাড়ানোর দাবি তোলে। এই বিষয়টি ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়।
নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলা
পোরাইয়ার এলাকায় ভোট চলাকালীন এক পুলিশ কনস্টেবলের উপর ছুরি হামলার ঘটনা ঘটে। আহত পুলিশকর্মীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং ঘটনাটির তদন্ত চলছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ
নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের জন্য ১৭টি দেশের ৩৪ জন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি তামিলনাড়ুতে উপস্থিত ছিলেন, যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গুরুত্বকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের উচ্চ ভোটদানের হার রাজ্যে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। শহর ও গ্রাম উভয় ক্ষেত্রেই অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ দেখা গেছে, যা ভোটারদের রাজনৈতিক সচেতনতা এবং পরিবর্তনের ইচ্ছাকে স্পষ্ট করে।
সব মিলিয়ে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে, উৎসবের মতো আবহে সম্পন্ন হওয়া এই নির্বাচন তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
উল্লেখ্য, তামিলনাড়ুতে এক দফাতেই ভোটগ্রহণ হয়েছে এবং ফল ঘোষণা হবে ৪ মে।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য