
বারাসাত ও কলকাতা, ২৪ এপ্রিল ( হি. স.) : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার আগে শুক্রবার রাজ্যের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক দিন হয়ে থাকল। এদিন একদিকে যেমন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পানিহাটি ও যাদবপুরের জনসভা থেকে তৃণমূল কংগ্রেসকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করলেন, তেমনই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ উত্তর ২৪ পরগনা ও হুগলিতে জোড়া সভা এবং কলকাতায় মেগা রোড শো করে জয়ের দাবি জোরালো করলেন। দুই শীর্ষ নেতার নিশানায় ছিল আর জি কর কাণ্ড, দুর্নীতি, সিন্ডিকেট রাজ এবং অনুপ্রবেশ সমস্যা।
এদিন সকালে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটিতে প্রথম সভা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এই কেন্দ্রটি এবার সারা দেশের নজরে রয়েছে, কারণ বিজেপি এখান থেকে আর জি কর হাসপাতালের নির্যাতিতা চিকিৎসকের মা-কে প্রার্থী করেছে। সভার শুরুতেই প্রার্থীর হাত ধরে প্রধানমন্ত্রী আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “এই মা তাঁর মেয়েকে ডাক্তার বানিয়েছিলেন অনেক স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু তৃণমূলের জঙ্গলরাজ সেই মেয়েকে আমাদের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। আমরা সেই মা-কে প্রার্থী করে সংসদের লড়াইয়ে নামিয়েছি।”
তৃণমূলকে ‘নারীবিরোধী দল’ বলে আক্রমণ করে মোদী বলেন, “বাংলার নারীশক্তি এবার নতুন ইতিহাস লিখতে চলেছে। তৃণমূলের জঙ্গলরাজ থেকে মুক্তি পেতে মহিলারা এবার ঢেলে ভোট দেবেন। ৪ তারিখের পর (ভোট গণনা) সব অত্যাচারের হিসাব হবে।” তিনি আরও বলেন যে, গতকাল প্রথম দফার নির্বাচনে যে বিপুল ভোট পড়েছে, তা দেখে তৃণমূল নেতারা স্তম্ভিত। প্রদীপ নেভার আগে যেমন শেষবার জ্বলে ওঠে, তৃণমূলের অবস্থাও এখন তেমনই।
পানিহাটির পর প্রধানমন্ত্রী পৌঁছন দক্ষিণ ২৪ পরগনার যাদবপুরে। সেখানে তিনি প্রথম দফার ভোটদানকে ‘বাম্পার’ এবং ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেন। প্রধানমন্ত্রীর দাবি, পশ্চিমবঙ্গ এবার রেকর্ড গড়বে এবং প্রথম দফার পর এটা স্পষ্ট যে বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর সুর অবলম্বন করেন। তিনি বলেন, “যাদবপুর ক্যাম্পাসের ভেতরে দেশবিরোধী দেওয়াল লিখন হচ্ছে, ছাত্রদের মিছিলে হাঁটতে বাধ্য করা হচ্ছে। যে সরকার রাজ্যের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্র বাঁচাতে পারে না, তারা রাজ্যকে কী বাঁচাবে? আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে এই অরাজকতা থেকে মুক্ত করব।” এছাড়াও সিন্ডিকেট ও তোলাবাজি নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, “বাংলায় বাড়ি বানাতে গেলে সিন্ডিকেটকে টাকা দিতে হয়। বালি-ইট-সিমেন্টে কাদের রাজত্ব চলে তা মানুষ জানে। বিজেপি এলে এই সিন্ডিকেট রাজ সমূলে বিনাশ করা হবে।”
শুক্রবার সকালে কলকাতায় এক সাংবাদিক বৈঠক এবং পরে উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জ ও হুগলির উত্তরপাড়ার সভা থেকে বড় দাবি করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি বলেন, “প্রথম দফার ১৫২টি আসনের মধ্যে বিজেপি ১১০টির বেশি আসনে জিততে চলেছে। সারা রাত ধরে বিশ্লেষণের পর আমরা এই বিষয়ে নিশ্চিত।”
শাহের নিশানায় ছিলেন তৃণমূলের ‘ভাইপো’ এবং অনুপ্রবেশকারীরা। হিঙ্গলগঞ্জের সভা থেকে তিনি হুঙ্কার দিয়ে বলেন, “তৃণমূলের গুন্ডারা শুনে রাখুন, ২৯ তারিখের পর আর বাড়ির বাইরে বেরোবেন না, না হলে উল্টো ঝুলিয়ে সোজা করে দেওয়া হবে। ৫ তারিখের পর ভাইপো ট্যাক্স বা কাটমানি দেওয়ার দিন শেষ হয়ে যাবে।” অনুপ্রবেশ সমস্যা নিয়ে তিনি বলেন, “মমতাদিদি নিজের ভোটব্যাঙ্কের জন্য অনুপ্রবেশকারীদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন। বিজেপি ক্ষমতায় আসলে এক এক জন অনুপ্রবেশকারীকে খুঁজে বের করে সীমান্ত পার করে দেওয়া হবে।”
মহিলাদের সুরক্ষা নিয়ে শাহ মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ করে বলেন, “একজন মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হয়ে তিনি বলেন সন্ধ্যা ৭টার পর মেয়েরা কেন বাইরে বেরোবেন? বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাত ২টোতেও বাংলার মেয়েরা নির্ভয়ে স্কুটি নিয়ে ঘুরতে পারবেন, কোনো গুন্ডা চোখ তুলে তাকানোর সাহস পাবে না।”
বিকেলের দিকে খাস কলকাতায় নেমে আসে জনজোয়ার। উত্তর কলকাতায় প্রধানমন্ত্রী এবং দক্ষিণ কলকাতায় অমিত শাহের পৃথক দুটি রোড শো মহানগরীকে কার্যত অবরুদ্ধ করে দেয়।
উত্তর কলকাতার সিমলা স্ট্রিটে স্বামী বিবেকানন্দের পৈতৃক আবাসে মাল্যদান করে প্রধানমন্ত্রী তাঁর রোড শো শুরু করেন। হুডখোলা গাড়িতে মোদীকে দেখতে রাস্তার দুপাশে মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। বিধান সরণি থেকে আমহার্স্ট স্ট্রিট পর্যন্ত এই দীর্ঘ পথে ছাদ থেকে পুষ্পবৃষ্টি করা হয়। একইভাবে দক্ষিণ কলকাতায় রাসবিহারী অ্যাভিনিউ থেকে হাজরা মোড় পর্যন্ত বর্ণাঢ্য রোড শো করেন অমিত শাহ। মেগা এই রোড শো থেকে শাহ বার্তা দেন যে, কলকাতায় এবার পরিবর্তনের হাওয়া বইছে এবং মানুষ হিংসামুক্ত সুশাসনের পক্ষে ভোট দেবেন।
নির্বাচনী প্রচারের এই ঝোড়ো শুক্রবার শেষে অমিত শাহ নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে লিখেছেন, “বাংলায় সুশাসনের এক নতুন যুগের সূচনার স্পষ্ট পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।” বিজেপি শিবিরের এই আত্মবিশ্বাস এবং প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর টানা কর্মসূচি দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে শাসক দল তৃণমূলের ওপর পাহাড় প্রমাণ চাপ সৃষ্টি করল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি