
ব্যারাকপুর ও কলকাতা, ২৭ এপ্রিল (হি.স.): পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনে ব্যারাকপুর থেকে একগুচ্ছ বড় ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতি দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সোমবার ব্যারাকপুরের এক বিশাল জনসভা থেকে তিনি দাবি করেন, ৪ মে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর পশ্চিমবঙ্গে কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের লক্ষ্যে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট কাজ দ্রুততার সঙ্গে শুরু করবে বিজেপি সরকার। একই সঙ্গে কলকাতার পরিচয় রক্ষা এবং রাজ্যের শিল্প পুনর্গঠনেও কড়া বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী।
কর্মসংস্থান নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ‘পঞ্চ-প্রতিশ্রুতি’
এদিনের সভা থেকে প্রধানমন্ত্রী বাংলার যুবক ও সরকারি কর্মচারীদের জন্য বড় আশ্বাস দিয়ে ৫টি পয়েন্ট উল্লেখ করেন:
১. স্বচ্ছ নিয়োগ ও রোজগার মেলা: প্রধানমন্ত্রী জানান, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলায় সরকারি নিয়োগ যথাসময়ে ঘোষণা করা হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখা হবে এবং ‘রোজগার মেলা’-র মাধ্যমে যুবকদের হাতে সরাসরি নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হবে।
২. শূন্যপদ পূরণ ও সপ্তম বেতন কমিশন : রাজ্যে সমস্ত শূন্য সরকারি পদ দ্রুত পূরণ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। মোদী বলেন, “সরকারি কর্মচারীরা তৃণমূলের ভয় থেকে মুক্ত হবেন এবং তাঁরা সপ্তম বেতন কমিশনের সম্পূর্ণ সুবিধা পাবেন।”
৩. সৃজনশীল অর্থনীতি ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ল্যাব: আধুনিক প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে বাংলার স্কুল ও কলেজে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ল্যাব’ স্থাপনের কথা বলেন তিনি, যা সৃজনশীল অর্থনীতির প্রসারে সাহায্য করবে।
৪. গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও ভিবি-জি রামজি আইন : গ্রামে ১২৫ দিনের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিজেপি সরকার গ্রামে কর্মসংস্থান প্রদানকারী ‘ভিবি-জি রামজি আইন’ বাস্তবায়ন করবে। এছাড়াও পিএম বিশ্বকর্মা ও পিএম সম্পদা যোজনা পুরোপুরি কার্যকর করা হবে।
৫. হকারদের উন্নয়ন: শহরের রাস্তার হকারদের জন্য ‘পিএম স্বনিধি যোজনা’র মাধ্যমে ব্যাংক ঋণের সুবিধা ও অন্যান্য সহায়তা নিশ্চিত করার কথা জানান তিনি।
তৃণমূলের ‘জঙ্গল রাজ’ ও শিল্পাঞ্চলের দুর্দশা
ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের বন্ধ হয়ে যাওয়া পাটকলগুলো নিয়ে তৃণমূল সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “গত কয়েক মাসে ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে প্রায় এক ডজন পাটকল বন্ধ হয়ে গেছে। একদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী কারখানা বন্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে গুন্ডাদের মদতে বোমার কারখানা ফুলেফেঁপে উঠছে। এটাই তৃণমূলের মহা জঙ্গল রাজ।” তিনি অভিযোগ করেন, তৃণমূল তাদের একসময়ের স্লোগান ‘মা, মাটি, মানুষ’-কে সম্পূর্ণ ভুলে গেছে। গত ১৫ বছরে তারা নারী নিরাপত্তা, কৃষক বা যুবকদের জন্য কিছুই করেনি।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলকাতাকে ‘লন্ডন’ বানানোর পুরনো প্রতিশ্রুতিকে কটাক্ষ করে মোদী বলেন, “তৃণমূল বলেছিল কলকাতাকে লন্ডন বানাবে, কিন্তু তারা কলকাতার বারোটা বাজিয়েছে। গত ১৫ বছরে তাদের মদতে এই শহর অনুপ্রবেশকারীতে ভরে গিয়েছে। আমরা কলকাতাকে লন্ডন নয়, কলকাতাই রাখতে চাই। কলকাতাকে ‘সিটি অফ জয়’-এর পাশাপাশি ‘সিটি অফ ফিউচার’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে।” তিনি কলকাতার পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং মেট্রো রেলের দ্রুত বিস্তারের ওপর জোর দেন।
রোড শো নয়, এ যেন তীর্থযাত্রা
ব্যারাকপুরের সভায় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। হেলিপ্যাড থেকে সভাস্থলে আসার পথে সাধারণ মানুষের ভিড় দেখে তিনি বলেন, “বাংলার এই রোড শো বা সভাগুলো আমার কাছে কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, এ যেন এক তীর্থযাত্রা। এই প্রচণ্ড গরমেও বাংলার মানুষের যা উৎসাহ দেখেছি, তাতে আমার ক্লান্তি আসছে না। আপনাদের এই অসীম প্রেমই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পুঁজি।” তিনি আরও যোগ করেন যে, ৪ মে-র পর বাংলায় বিজেপির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে আসার বিষয়ে তিনি আত্মবিশ্বাসী।
‘অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ’—পূর্ব ভারতের ভাগ্যবদল
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে ভারতের প্রাচীন সমৃদ্ধির তিন স্তম্ভ—অঙ্গ (বিহার), বঙ্গ (বাংলা) এবং কলিঙ্গ (ওড়িশা)-র কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “ভারতের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ তখনই সম্ভব যখন পূর্ব ভারতের উন্নতি হবে। বিহার ও ওড়িশায় ডবল ইঞ্জিন সরকার কাজ শুরু করেছে, এবার বাংলার পালা। বাংলায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্কল্প পূরণ করবে বিজেপি সরকার। জম্মু-কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা রদ করার মতো কঠিন কাজ আমরা করেছি, এবার বাংলার উন্নয়নের পালা।”
অনুপ্রবেশ ও নাগরিকত্ব নিয়ে বড় গ্যারান্টি
প্রধানমন্ত্রী এদিন আবারও স্পষ্ট করে দেন যে, বিজেপি জমানায় কোনো প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকের সমস্যা হবে না। তবে অনুপ্রবেশকারীদের কোনোভাবেই ছাড়া হবে না। মতুয়া ও নমশূদ্র সম্প্রদায়ের উদ্দেশে তিনি বলেন, “নাগরিকত্ব মিলবেই। আপনারা ভারতীয় নাগরিকদের মতোই সব কাগজ ও অধিকার পাবেন। এটা মোদীর গ্যারান্টি।” তিনি কংগ্রেস, বাম ও তৃণমূলের জোটকে আক্রমণ করে বলেন, “আপনারা ৭০ বছর ওদের দিয়েছেন, এবার একটা সুযোগ বিজেপিকে দিন। আমরা সিন্ডিকেট, কাটমানি আর অনুপ্রবেশের হাত থেকে বাংলাকে মুক্তি দেব।”
বাংলায় প্রধানমন্ত্রীর অডিও বার্তা
ব্যারাকপুরের সভা শেষে প্রধানমন্ত্রী তাঁর এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেলে বাংলার মানুষের উদ্দেশে একটি ৭ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডের বিশেষ অডিও বার্তা শেয়ার করেন। সেখানে তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে আমার প্রিয় পরিবারবর্গ, ২৯ এপ্রিল ভোটদানের নতুন রেকর্ড গড়ুন। বিকশিত বাংলা গড়ার এই সুযোগ হাতছাড়া করবেন না।”
সব মিলিয়ে, নির্বাচনের ঠিক আগে প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই ব্যারাকপুর সফর এবং কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে অনুপ্রবেশ—প্রতিটি বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি