(লিড ) জম্মু পর্যন্ত বন্দে ভারতের সম্প্রসারণ, ২০ কোচে কাশ্মীরে রেল সংযোগে নতুন যুগ
জম্মু, ৩০ এপ্রিল (হি.স.): হিমালয়ের বুক চিরে এগিয়ে চলা এক দীর্ঘ স্বপ্নের পরিণতি—জম্মু থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত সরাসরি রেল সংযোগ আর কেবল পরিকল্পনা নয়, এখন বাস্তব। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা প্রকৌশল, রাজনীতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং প্রকৃতির সঙ্গে ন
রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব


জম্মু, ৩০ এপ্রিল (হি.স.):

হিমালয়ের বুক চিরে এগিয়ে চলা এক দীর্ঘ স্বপ্নের পরিণতি—জম্মু থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত সরাসরি রেল সংযোগ আর কেবল

পরিকল্পনা নয়, এখন বাস্তব। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা প্রকৌশল, রাজনীতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিরন্তর লড়াইয়ের ফল হিসেবে শ্রীনগর-কাটরা বন্দে ভারত এক্সপ্রেস এবার সম্প্রসারিত হয়ে পৌঁছে গেল জম্মু তাওয়াই পর্যন্ত।

কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব বৃহস্পতিবার এই সম্প্রসারিত পরিষেবার সূচনা করেন, উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং এবং মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ। আগে যেখানে ট্রেনটি শুধুমাত্র শ্রীনগর থেকে শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী কাটরা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা দেশের একটি প্রধান রেল জংশন—জম্মুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে। ৮ কোচ থেকে ২০ কোচে সম্প্রসারণ এই পরিষেবাকে শুধু বড় করেনি, বরং এর প্রতীকী গুরুত্বও বহুগুণ বাড়িয়েছে।

এই পরিবর্তনটিকে অনেকেই শুধুমাত্র একটি রেল পরিষেবা বৃদ্ধি হিসেবে দেখছেন না; বরং এটি কাশ্মীর উপত্যকার দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা ভাঙার এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

উধমপুর-শ্রীনগর-বারামুলা রেল লিঙ্ক বা USBRL প্রকল্প—যা প্রায় ২৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ—ভারতের অন্যতম জটিল এবং উচ্চাভিলাষী অবকাঠামো প্রকল্প। এই রুটে ৩৬টি সুড়ঙ্গ, মোট প্রায় ১১৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের, এবং ৯৪৩টি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি অংশই যেন এক একটি প্রকৌশল কীর্তি, যেখানে প্রযুক্তি ও সাহসের মেলবন্ধন ঘটেছে।

এই রেল সংযোগের আগে কাশ্মীরের সঙ্গে দেশের যোগাযোগ মূলত নির্ভর করত সড়কপথের উপর। শীতকালে ভারী তুষারপাত, বর্ষায় ভূমিধস, কিংবা হঠাৎ আবহাওয়ার পরিবর্তনে সেই যোগাযোগ বারবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। ফলে শুধু সাধারণ মানুষের যাতায়াত নয়, খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধ—সবকিছুর সরবরাহই অনিশ্চিত হয়ে পড়ত।

এই বাস্তবতায় রেল সংযোগের গুরুত্ব শুধু সুবিধার নয়—এটি জীবনরেখা। নতুন বন্দে ভারত পরিষেবার সূচি সেই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই সাজানো হয়েছে। ২৬৪০১ নম্বর ট্রেনটি ভোর ৬:২০-এ জম্মু তাওয়াই থেকে ছেড়ে কাটরা, রিয়াসি ও বানিহাল হয়ে প্রায় ৪ ঘণ্টা ৫০ মিনিটে শ্রীনগরে পৌঁছবে। ফিরতি ২৬৪০২ ট্রেন দুপুর ২টায় ছেড়ে সন্ধ্যার মধ্যে জম্মু পৌঁছে যাবে। দ্বিতীয় জোড়া ট্রেনও একইভাবে সকালে ও দুপুরে যাত্রীদের বিকল্প দিচ্ছে, যা এই করিডোরে চলাচলকে আরও নমনীয় করে তুলবে।

এই ট্রেনজোড়া সপ্তাহে ছ’দিন চলবে, ফলে যাত্রীদের পরিকল্পনা আরও সহজ হবে।

যাত্রী পরিষেবার দিক থেকেও এই সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীনগর থেকে কাটরা পর্যন্ত ভাড়া চেয়ার কারে ৭১৫ টাকা এবং এক্সিকিউটিভ ক্লাসে ১৩২০ টাকা নির্ধারিত হয়েছে—যা এই ধরনের আধুনিক পরিষেবার তুলনায় তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। জম্মু পর্যন্ত ভাড়া ঘোষণার অপেক্ষা থাকলেও, যাত্রী চাহিদা বাড়বে তা স্পষ্ট।

তবে এই প্রকল্পের প্রকৃত গুরুত্ব লুকিয়ে আছে এর অবকাঠামোগত বিস্ময়গুলির মধ্যে। চেনাব রেল সেতু—এই প্রকল্পের মুকুটমণি—নদীর তলদেশ থেকে ৩৫৯ মিটার উচ্চতায় দাঁড়িয়ে, যা আইফেল টাওয়ারের থেকেও প্রায় ৩৫ মিটার বেশি। বিশ্বের দ্বিতীয় উচ্চতম রেল আর্চ ব্রিজ হিসেবে এটি শুধু ভারতের নয়, বিশ্ব প্রকৌশলের মানচিত্রে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করেছে।

এই সেতুটি ২৬৬ কিমি/ঘণ্টা বেগের ঝড়ো হাওয়া সহ্য করতে পারে, রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে টিকে থাকতে পারে, এমনকি ৪০ কেজি টিএনটি বিস্ফোরণের মতো আঘাতও সহ্য করার মতো করে তৈরি।

অন্যদিকে, অঞ্জি খাড সেতু ভারতের প্রথম কেবল-স্টেইড রেল ব্রিজ। প্রায় ৪৭৩ মিটার দীর্ঘ এই সেতুটি ৩৩১ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এবং একটি একক পিলার থেকে ৯৬টি কেবলের মাধ্যমে পুরো কাঠামোকে ধরে রাখা হয়েছে। এই ধরনের নকশা হিমালয়ের মতো ভূপ্রকৃতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সুড়ঙ্গ নির্মাণও ছিল এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলির একটি। টি-৪৯ সুড়ঙ্গ, যার দৈর্ঘ্য ১২.৭৫ কিলোমিটার, এখন ভারতের দীর্ঘতম রেল সুড়ঙ্গগুলির মধ্যে অন্যতম।

পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৩,৭৮০ কোটি টাকা—যা এর জটিলতা ও বিস্তৃতির প্রতিফলন। শুধু অবকাঠামো নয়, প্রযুক্তির দিক থেকেও এই প্রকল্প আধুনিকতার শীর্ষে। বন্দে ভারত ট্রেনগুলিকে বিশেষভাবে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে শূন্যের নিচে তাপমাত্রাতেও সেগুলি নির্বিঘ্নে চলতে পারে। সিলিকন হিটিং প্যাড, পাইপলাইন গরম রাখার ব্যবস্থা, ডিফ্রস্টিং সিস্টেম, হিটারযুক্ত শৌচাগার—সব মিলিয়ে এটি ভারতের রেল প্রযুক্তির এক নতুন অধ্যায়।

এই রেল সংযোগের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে অর্থনীতিতে। কাশ্মীরের আপেল, বাদাম, শুকনো ফল—যেগুলি এতদিন পরিবহণ সমস্যার কারণে ক্ষতির মুখে পড়ত—এখন দ্রুত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছতে পারবে। এর ফলে কৃষকদের আয় বাড়বে, বাজার সম্প্রসারিত হবে, এবং কাশ্মীরের অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।

পর্যটন ক্ষেত্রেও এর প্রভাব ব্যাপক। বৈষ্ণোদেবী যাত্রা, শ্রীনগর ভ্রমণ—সব মিলিয়ে এই রেল সংযোগ উত্তর ভারতের পর্যটন মানচিত্রকে নতুনভাবে সাজিয়ে তুলবে। তবে এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রতিরক্ষা। কাশ্মীর ও লাদাখের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে সেনা মোতায়েন এবং রসদ সরবরাহ দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সড়কপথে ২-৩ দিন সময় লাগত, যা এখন কয়েক ঘণ্টায় সম্ভব হবে।

যুদ্ধ পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জরুরি অবস্থায় এই রেলপথ একটি নির্ভরযোগ্য লাইফলাইন হিসেবে কাজ করবে।

এই প্রকল্পের ইতিহাসও সমান আকর্ষণীয়। মহারাজা হরি সিং-এর সময় থেকেই কাশ্মীরকে রেলপথে যুক্ত করার স্বপ্ন ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৮৩ সালে ইন্দিরা গান্ধী জম্মু-উধমপুর রেললাইনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর অটল বিহারী বাজপেয়ী সরকার ২০০২ সালে কাশ্মীর পর্যন্ত রেল সংযোগের সিদ্ধান্ত নেয়।

বহু বছর ধরে নানা বাধা পেরিয়ে অবশেষে ২০২৪ সালে প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হয়—চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যাত্রা ভারতের অবকাঠামো ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

ভবিষ্যতের দিক থেকেও এই প্রকল্প একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। বারামুলা-উরি, সোপোর-কুপওয়ারা, অনন্তনাগ-পহেলগাঁও—এমন আরও কয়েকটি নতুন রেললাইনের পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। বিলাসপুর-মানালি-লেহ রেললাইনকে কৌশলগত প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, জম্মু-শ্রীনগর বন্দে ভারত এক্সপ্রেস শুধু একটি ট্রেন নয়—এটি একটি রূপান্তরের প্রতীক। উন্নয়ন, সংযোগ, নিরাপত্তা এবং সম্ভাবনার এক নতুন অধ্যায়, যা কাশ্মীর উপত্যকার ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে।

---------------

হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য




 

 rajesh pande