
রায়পুর, ৩০ এপ্রিল (হি. স.) : কাগজে ছিল লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর নাম, বাস্তবে তাদের অস্তিত্বই নেই—এমনই চাঞ্চল্যকর চিত্র সামনে এল ছত্তিশগড়ের সরকারি স্কুলগুলিতে। আধার সংযুক্তিকরণ ও ডিজিটাল যাচাইকরণের পর রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় ভুয়ো নামভুক্তির বিশাল চক্র ফাঁস হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইউ-ডাইস পোর্টালে তথ্য যাচাই ও ছাঁটাইয়ের পর ১০ লক্ষেরও বেশি ‘ভূতুড়ে ছাত্র’-এর নাম মুছে গিয়েছে।
শিক্ষা দফতরের আধিকারিকদের মতে, এতদিন স্কুলগুলিতে শুধুমাত্র মোট ছাত্রসংখ্যা নথিভুক্ত করা হত। ফলে সহজেই কাগজে নাম বাড়িয়ে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানোর সুযোগ ছিল। কিন্তু সম্প্রতি কেন্দ্র ও রাজ্যের উদ্যোগে ছাত্রছাত্রীদের নামের সঙ্গে আধার নম্বর ও মোবাইল নম্বর বাধ্যতামূলক করা হলে চিত্র পাল্টাতে শুরু করে। আধারের সঙ্গে তথ্য মেলানোর সময়ই বিপুল সংখ্যক ভুয়ো ও ডুপ্লিকেট নাম ধরা পড়ে এবং পোর্টাল থেকে বাদ যায়।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে যেখানে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ৫৩.৬৯ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর জন্য বই ছাপানো হয়েছিল, ২০২৬ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৩ লক্ষে। অর্থাৎ প্রায় ১০ লক্ষ ছাত্রছাত্রী কেবল নথিতেই ছিল। এর জেরে এ বছর প্রায় ৫০ লক্ষ কম বই ছাপাতে হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
অভিযোগ, এই ‘ভূতুড়ে ছাত্রদের’ নামে বহু বছর ধরে বই, মিড-ডে মিল, ইউনিফর্ম, সাইকেল-সহ বিভিন্ন প্রকল্পে সরকারি অর্থ বরাদ্দ হচ্ছিল। হিসেব কষে দেখা যাচ্ছে, গত চার বছরে প্রায় ২৫ লক্ষ অতিরিক্ত ছাত্রের জন্য বই ছাপাতে গিয়ে প্রায় ৬২.৫০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অঙ্ক আরও বড় হতে পারে, কারণ অন্যান্য প্রকল্পেও একই ধরনের অনিয়মের সম্ভাবনা রয়েছে।
শুধু নামভুক্তিতেই নয়, শিক্ষা ব্যবস্থার একাধিক স্তরে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কবর্ধা ব্লকের শিক্ষা আধিকারিকের দফতরে ২১৮ কোটি টাকার আর্থিক গরমিলের অভিযোগ সামনে এসেছে, যেখানে নথি ছাড়াই টাকা তোলার ঘটনা ধরা পড়েছে। দুর্গ ও ভিলাইয়ের স্বামী আত্মানন্দ স্কুলগুলিতে ভুয়ো নিয়োগপত্র এবং নকল ডিজিটাল সইয়ের মাধ্যমে চাকরি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিলাসপুর ও মুংগেলি জেলাতেও ভুয়ো স্বীকৃতি দেখিয়ে ছাত্রভর্তি এবং সরকারি তহবিল আত্মসাতের তদন্ত চলছে।
এই কেলেঙ্কারি সামনে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য সরকার। ইতিমধ্যেই রায়পুর ও সর্গুজা বিভাগের তিন যুগ্ম অধিকর্তা-সহ প্রায় ১০ জন শীর্ষ আধিকারিককে সাসপেন্ড করা হয়েছে। পাশাপাশি পাঠ্যপুস্তক নিগমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজেন্দ্র কাটারার নেতৃত্বে একটি উচ্চস্তরের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা বই ছাপানো থেকে শুরু করে আর্থিক লেনদেন—সব দিক খতিয়ে দেখছে।
শিক্ষা দফতরের শীর্ষ কর্তাদের দাবি, আধার সংযুক্তিকরণের ফলে পুরো ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আসছে। তাঁদের কথায়, “যে ১০ লক্ষ ভুয়ো নাম বাদ পড়েছে, তার ফলে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার সরকারি খরচ বাঁচবে।” একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি—যে কোনও স্তরে জড়িত থাকলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে প্রশ্ন উঠছে, এতদিন ধরে কীভাবে এই বিপুল জালিয়াতি নজরের বাইরে রইল। প্রশাসনের একাংশের মতে, স্থানীয় স্তরে তথ্য যাচাইয়ের অভাব এবং দীর্ঘদিনের শিথিল ব্যবস্থার সুযোগ নিয়েই এই ‘ভূতুড়ে ছাত্র’ চক্র গড়ে উঠেছিল। এখন ডিজিটাল নজরদারির জালে সেই কারসাজি ধরা পড়তেই সামনে আসছে প্রকৃত চিত্র।
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য