
বক্সনগর (ত্রিপুরা), ১৩ মে (হি.স.) : বিয়ের মাত্র পাঁচ বছর। ছোট্ট সংসার, স্বামী, এক ছেলে ও এক মেয়ে—এই নিয়েই ছিল ২৩ বছরের তরুণী গৃহবধূ জয়িতা সরকারের স্বপ্নমাখা জীবন। কিন্তু সেই স্বপ্নের ঘর যে প্রতিদিনই নিঃশব্দে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল, তা হয়তো কেউ বুঝতেই পারেননি। অবশেষে দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে নিজের শরীরে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন জয়িতা সরকার। তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে সিপাহীজলা জেলার কাঁঠালিয়া ব্লকের ভবানীপুর এলাকা।
পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই জয়িতা সরকারের উপর চলত অকথ্য অত্যাচার। অভিযোগের তীর স্বামী বিপদ সরকার (৩৫), শাশুড়ি ঝর্ণা সরকার (৫৪) এবং শ্বশুর পরিমল সরকারের দিকে। স্বামী কর্মসূত্রে চেন্নাইয়ে থাকলেও বাড়ি ফিরলেই শুরু হতো অশান্তি, গঞ্জনা ও নির্যাতন। দিনের পর দিন অপমান, কষ্ট ও মানসিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে বেড়াতে একসময় ভেঙে পড়েন জয়িতা সরকার।
গত রবিবার আর সহ্য করতে না পেরে নিজের শরীরে আগুন লাগিয়ে দেন তিনি। পরিবারের সদস্যরা গুরুতর অবস্থায় তাঁকে আগরতলার জিবিপি হাসপাতালে ভর্তি করেন। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। সোমবার রাত ৯টা নাগাদ মৃত্যু হয় তরুণী গৃহবধূর।
এই ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো জয়িতার দুই অবুঝ সন্তান। এক ছেলে ও এক মেয়ে—যাদের বয়স এতটাই কম যে তারা এখনও বুঝে উঠতে পারেনি কেন তাদের মা আর ঘুম থেকে উঠছেন না। ঘরে এখন শুধু কান্না আর শোকের ছায়া। মা নেই, আর বাবা পুলিশের হেফাজতে। দুই শিশুর অসহায় চোখে যেন একটাই প্রশ্ন—“মা কোথায়?” সেই নির্বাক চাহনি দেখে অশ্রু ধরে রাখতে পারছেন না প্রতিবেশীরাও।
জয়িতা সরকারের মা ও পরিবারের সদস্যদের অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে যাত্রাপুর থানার পুলিশ। মঙ্গলবার ভবানীপুরের বাড়ি থেকে স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়িকে আটক করা হয়। বুধবার যাত্রাপুর থানার ওসি পার্থনাথ ভৌমিক জানান, এ ঘটনায় একটি মামলা রুজু হয়েছে এবং ধৃত তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আত্মহত্যার পেছনে নির্যাতন, প্ররোচনা বা অন্য কোনও কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শান্ত ও নিরিবিলি ভবানীপুর গ্রামে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পর নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। প্রতিবেশীরা বলছেন, জয়িতা সরকার ছিলেন শান্ত স্বভাবের, সহনশীল ও সংসারী একজন মেয়ে। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে সবকিছু নীরবে সহ্য করতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অত্যাচারের আগুনেই নিভে গেল তাঁর জীবনপ্রদীপ।
জয়িতা সরকারের মৃত্যুর সঙ্গে শুধু একটি তরুণ প্রাণের অবসান ঘটেনি; ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে দুটি শিশুর শৈশব, অনিশ্চয়তায় পড়েছে তাদের ভবিষ্যৎ। এখন এলাকার মানুষের একটাই দাবি—এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ