
নয়াদিল্লি, ১০ জুন (হি. স.) : দেশের ইতিহাসে দীর্ঘতম মেয়াদের ‘নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী’ হওয়ার অনন্য নজির গড়েছেন নরেন্দ্র মোদী। এই বিশেষ সাফল্য উদযাপন উপলক্ষে বুধবার নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে এনডিএ শাসিত সমস্ত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং জোটের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সারলেন তিনি। আর সেই মঞ্চ থেকেই বিরোধীদের কড়া ভাষায় আক্রমণ করার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক সাফল্য ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা স্পষ্ট করলেন প্রধানমন্ত্রী।
বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী জানান, এত দীর্ঘ সময় ধরে 'মা ভারতী'-র সেবা করার সৌভাগ্য কেবল পরমেশ্বরের বিশেষ কৃপাতেই সম্ভব হয়েছে। তবে এই সাফল্যকে তিনি ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখতে নারাজ। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, এই রেকর্ডের পেছনে এনডিএ জোটের প্রতিটি শরিক দলের সমান অবদান রয়েছে। এই উপলক্ষে জোটের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ প্রস্তাবও পেশ করা হয়। মোদী বলেন, আমার কাছে দেশের জনগণই হলেন ঈশ্বরের মূর্ত প্রতীক। তাই এই সেবাকে আমি এক আধ্যা沐িক সাধনা হিসেবেই গণ্য করি।
প্রধানমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন, ২০১৪ সালে এনডিএ ক্ষমতায় আসার আগে কয়েক দশক ধরে দেশের রাজনীতি চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে, যার ফলে ভারতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। কিন্তু গত ১২ বছর ধরে এনডিএ দেশকে একটি স্থায়ী ও মজবুত সরকার উপহার দিয়েছে। আজ মানুষ একটি স্থিতিশীল সরকারের কার্যকারিতা দেখছে এবং তার বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাকে প্রশংসা করছে। ২০১৪ সালে যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল, আজ এনডিএ পরিবার হিসেবে আমরা দেশবাসীর সেই আস্থার পূর্ণ মর্যাদা দিতে পেরেছি।
প্রধানমন্ত্রীর দাবি, সরকারের সঠিক নীতি ও সিদ্ধান্তের জেরেই গত এক দশকে ২৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে উপরে উঠে এসেছেন। তৈরি হয়েছে এক বিশাল নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যাদের আর কোনোভাবেই পিছিয়ে যেতে দেওয়া হবে না বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
এদিনের বৈঠক থেকে কংগ্রেসের অতীত অর্থনৈতিক নীতিকে তীব্র আক্রমণ করেন নরেন্দ্র মোদী। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘকাল ধরে কংগ্রেস দেশবাসীকে চরম দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব এবং হীনম্মন্যতার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। উন্নয়ন যে অত্যন্ত ধীর গতিতেই হয়, এমন একটি ধারণাও তৈরি করা হয়েছিল।
মোদী বলেন, চতুরতার সঙ্গে এই ধীরগতির প্রবৃদ্ধিকে কংগ্রেস 'হিন্দু গ্রোথ রেট' বলে প্রচার করেছিল। নিজেদের কাজের ধরন, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং ব্যর্থতার কলঙ্ক তারা চাপিয়ে দিয়েছিল দেশের বিশাল হিন্দু জনগোষ্ঠীর ঘাড়ে। কিন্তু বাস্তবে এই পরিস্থিতির নাম হওয়া উচিত ছিল 'কংগ্রেস গ্রোথ রেট'।
এদিন তিনি যোগ করেন, সুশাসন, সঠিক নীতি এবং সৎ উদ্দেশ্যের অভাবের কারণেই সেই সময়ে এই দশা হয়েছিল। মাঝে অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে উন্নয়নের ঝলক দেখা গেলেও, পরবর্তীকালে কংগ্রেস দেশকে একের পর এক কেলেঙ্কারির অতল গহ্বরে ডুবিয়ে দেয়। ২০১৪ সালের পর সেই ধারার অবসান ঘটেছে।
বিশ্বের বড় বড় দেশগুলির বর্তমান টালমাটাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে মোদী ভারতের সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিশ্বব্যাপী মন্দার আবহেও ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারত ৭.৭ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করেছে, যা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। আজ ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থে সরকারের কর ছাড়ের কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের আগে মধ্যবিত্তরা কর ব্যবস্থার জটিলতা ও আইনি মারপ্যাঁচে জর্জরিত ছিলেন। আমরা তাদের সমস্যা বুঝেছি, আর তাই আজ ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত করা হয়েছে।
দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নিরাপত্তার স্বার্থে জ্বালানি, খনিজ সম্পদ, সেমিকন্ডাক্টর চিপ, ব্যাটারি স্টোরেজ, মহাকাশ প্রযুক্তি, ড্রোন, ডেটা সেন্টার, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে বিদেশি নির্ভরতা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার ডাক দেন মোদী। এই কারণেই বর্তমান সরকার সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে বিশেষ জোর দিচ্ছে।
বক্তব্যের শেষে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস এবং সবকা প্রয়াস’—এই মূলমন্ত্রকে পাথেয় করে উন্নত ভারত গড়ার ডাক দেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের সামগ্রিক উন্নতির স্বার্থে বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে একটি ‘সুস্থ প্রতিযোগিতা’ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি