
চেন্নাই, ১৮ জুন (হি.স.): নবনির্বাচিত টিভিকে নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের অধীনে তামিলনাড়ু বিধানসভার ১৭তম অধিবেশনের প্রথম বৈঠক বৃহস্পতিবার শুরু হয়। অধিবেশনের সূচনায় রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকর প্রায় ৩৯ মিনিটের ভাষণে নতুন সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার, জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনার বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেন।
ভাষণের শেষে তিরুক্কুরাল থেকে একটি শ্লোক উদ্ধৃত করে রাজ্যপাল সরকারের পাঁচ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা ‘ভেট্রি তামিঝাগম’-এর ঘোষণা করেন। এই কর্মসূচির লক্ষ্য ২০৩১ সালের মধ্যে তামিলনাড়ুকে দেশের অন্যতম আদর্শ ও উন্নত রাজ্যে পরিণত করা।
এদিন রাজ্যপাল জানান, প্রবীণ নাগরিক ও পেনশনভোগীদের জন্য চালু থাকা সমস্ত কল্যাণমূলক প্রকল্প পূর্বের মতোই অব্যাহত থাকবে। একইসঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি পরিকাঠামো, শিক্ষা এবং ক্রীড়া ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর সরকার বিশেষ গুরুত্ব দেবে।
ক্রীড়া উন্নয়নের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে তামিলনাড়ুর খেলোয়াড়দের প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আধুনিক অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
মন্দির পরিচালনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন রাজ্যপাল। তিনি জানান, হিন্দু রিলিজিয়াস অ্যান্ড চ্যারিটেবল এনডাউমেন্টস (এইচআর অ্যান্ড সিই) দফতরের অধীন সমস্ত মন্দিরের নিরীক্ষা (অডিট) করা হবে। এর মাধ্যমে মন্দির পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
আন্তঃরাজ্য জলবণ্টন ইস্যুতেও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি। কর্ণাটকের প্রস্তাবিত মেকেদাতু বাঁধ প্রকল্পের বিরোধিতায় তামিলনাড়ুর অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানিয়ে রাজ্যপাল বলেন, কাবেরী নদীর জলের ন্যায্য অংশ রক্ষায় সরকার সমস্ত সাংবিধানিক ও আইনি পথ অনুসরণ করবে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ জল সংরক্ষণের জন্য আরও বেশি সংখ্যায় চেক ড্যাম নির্মাণ এবং বৃষ্টির জল সংরক্ষণ প্রকল্প সম্প্রসারণের কথাও ঘোষণা করা হয়।
মুল্লাপেরিয়ার বাঁধ নিয়েও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়। কেরল নতুন বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়ে এলেও তামিলনাড়ু নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় অনড় থাকবে বলে রাজ্যপাল জানান।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিকেও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, মাদকের বাড়বাড়ন্ত রুখতে রাজ্যের প্রতিটি জেলায় বিশেষ অ্যান্টি-নারকোটিক্স ইউনিট গঠন করা হয়েছে। একইসঙ্গে বেআইনি মদ বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো হবে। মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রেও কঠোর অবস্থান নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।
রাজ্যের দীর্ঘদিনের দুই-ভাষা নীতির প্রতি সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে রাজ্যপাল কেন্দ্র সরকারের কাছে সমন্বিত শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আহ্বান জানান। পাশাপাশি দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
রাজ্যপালের বক্তব্যে টিভিকে-র রাজনৈতিক উত্থানও বিশেষভাবে উঠে আসে। তিনি বলেন, তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে টিভিকে-র আবির্ভাব একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। তাঁর মতে, এই উত্থান ১৯৬৭ সালে সি. এন. আন্নাদুরাই এবং ১৯৭৭ সালে এম. জি. রামচন্দ্রনের নির্বাচনী সাফল্যের মতোই তাৎপর্যপূর্ণ। মাত্র দু'বছরের মধ্যে দলটি সরকার গঠন করেছে এবং সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অতীতে রাজ্যপালের ভাষণকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার থেকে সরে এসে এদিনের ভাষণে সমাজ সংস্কারক পেরিয়ার ই. ভি. রামাসামি, সংবিধান প্রণেতা ড. বি. আর. আম্বেদকর, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কে. কামরাজ, স্বাধীনতা সংগ্রামী ভেলু নাচিয়ার এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মী অঞ্জালাই আম্মালের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাজ্যপাল। তিনি বলেন, তাঁদের আদর্শ থেকেই বর্তমান সরকারের নীতি ও কর্মসূচি অনুপ্রাণিত হয়েছে।
ভাষণের শুরুতে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সি. এন. আন্নাদুরাইয়ের উল্লেখ করে রাজ্যপাল আশা প্রকাশ করেন, নতুন বিধানসভা গঠনমূলক আলোচনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে তামিলনাড়ুর মানুষের কল্যাণ ও রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য