


- ‘২০১৪ সালের পর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলির জন্য বিদেশি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্পের সহায়তা ৯ হাজার কোটি টাকা থেকে সাত গুণের বেশি ৭৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে’
- প্রধানমন্ত্রী মোদীর ধারাবাহিক গুরুত্বারোপে যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিকাঠামো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রূপান্তর ত্বরান্বিত হচ্ছে’
- উন্নয়নের সঙ্গে ঐতিহ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং উদ্যোক্তা মানসিকতার সমন্বয় ঘটানোর আহ্বান সীতারমণের
শিলং, ১৯ জুন (হি.স.) : মেঘালয়ের সংযোগ ব্যবস্থা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, পর্যটন, জীবিকা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদারের লক্ষ্যে ১,২৫০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেনকেন্দ্রীয় অর্থ ও কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ।
শিলঙের ইউ সোসো থাম অডিটোরিয়ামে আয়োজিত মেঘালয়ে ‘বিদেশি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্প’ (এক্সটাৰ্নালি এইডেড প্ৰজেক্টস) উদযাপন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থ ও কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রী নির্মলা। এ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য পেশ করেছেন তিনি। উপস্থিত অভ্যাগতদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বলেন, মেঘালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করার জন্য খ্যাতনামা খাসি কবি ইউ সোসো থামের নামে নামাঙ্কিত এই অডিটোরিয়ামের চেয়ে উপযুক্ত স্থান আর হতে পারে না। তিনি বলেন, কবির রচনায় পাহাড়ের সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও চেতনার যে প্রতিফলন দেখা যায়, তা আজও মেঘালয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উৎস।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের সম্ভাবনা তুলে ধরে সীতারমণ বলেন, এই অঞ্চল মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, বৈচিত্র্যময় কৃষিপণ্য এবং পরিশ্রমী মানুষের আশীর্বাদপ্রাপ্ত। তিনি বলেন, নীতিনির্ধারকদের সামনে চ্যালেঞ্জ সম্ভাবনার অভাব নয়, সেই সম্ভাবনাকে স্থানীয় জনগণের সমৃদ্ধিতে রূপান্তরিত করা।
অঞ্চলটির অনন্য কৃষি সম্পদের প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী উত্তরপূর্বের বিভিন্ন রাজ্যের উল্লেখযোগ্য পণ্যের উদাহরণ দেন। এর মধ্যে রয়েছে অরুণাচল প্রদেশের কমলা ও কিউই, অসমের লিচু ও আদা, মণিপুরের চাক-হাও (কালো চাল) ও কাছাই লেবু, মেঘালয়ের লাকাডং হলুদ, মেমাং নারাং, খাসি ম্যান্ডারিন ও আদা, মিজোরামের মিজো মরিচ, নাগাল্যান্ডের ট্রি টমেটো ও মিষ্টি শসা, সিকিমের বড় এলাচ, অর্কিড ও জৈব কৃষিপণ্য এবং ত্রিপুরার বিখ্যাত কুইন আনারস। তিনি বলেন, এই পণ্যগুলির অনেকগুলিরই বিশ্ববাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, তবে তাদের পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উন্নত বাজার সংযোগ, লজিস্টিকস ও মূল্য সংযোজন প্রয়োজন।
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারত সরকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং ধারাবাহিক যোগাযোগকে উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিয়েছে। তিনি জানান, ২০১৪ সালের পর থেকে প্রধানমন্ত্রী ৭৫ বারেরও বেশি উত্তর-পূর্বাঞ্চল সফর করেছেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা সম্মিলিতভাবে ৭০০-এর বেশি সফর করেছেন, যা এই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের প্রতি সরকারের অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে।
গত এক দশকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পরিকাঠামোগত উন্নয়নের প্রসঙ্গ টেনে সীতারমণ বলেন, ২০১৪ সালের পর থেকে ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগে ১০ হাজার কিলোমিটারের বেশি জাতীয় সড়ক নির্মিত হয়েছে এবং আরও ৫ হাজার কিলোমিটার সড়ক প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়নের পর্যায়ে। তিনি জানান, ২০১৪ সালে যেখানে এই অঞ্চলে কার্যকর বিমানবন্দরের সংখ্যা ছিল নয়টি, বর্তমানে তা বেড়ে ১৬টিতে পৌঁছেছে। একই সময়ে বিমান চলাচল প্রায় দ্বিগুণ এবং অভ্যন্তরীণ যাত্রী পরিবহণ তিন গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিদেশি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলির গুরুত্ব তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, এই প্রকল্পগুলি বৃহৎ পরিকাঠামোগত বিনিয়োগকে পরিপূরক করে এবং স্থানীয় আর্থ-সামাজিক চাহিদা পূরণে সহায়তা করে। অর্থায়নের পাশাপাশি এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক, এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (আইএফএডি) এবং জাইকা (জেআইসিএ)-র মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জ্ঞান, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি এবং সফল উন্নয়ন মডেলের সুবিধা পাওয়া যায়।
দিনের শুরুতে রি-ভোই জেলার ভোইরিমবঙে উদ্বোধিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বৃহত্তম জৈব মশলা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রের উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই প্রকল্পটি স্থানীয় কৃষিপণ্যকে স্থানীয় পর্যায়েই প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে কৃষকদের অধিক মূল্য অর্জনের সুযোগ করে দিচ্ছে এবং ঐতিহ্যবাহী কৃষি শক্তিকে আধুনিক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, এটি এমন এক আদর্শ উন্নয়ন মডেল যেখানে স্থানীয় সম্পদ, জনসম্পৃক্ততা এবং বৈশ্বিক দক্ষতা একত্রিত হয়ে টেকসই অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করে।
জোর দিয়ে তিনি বলেন, বিদেশি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলি শুধুমাত্র অর্থায়নের ব্যবস্থা নয়, প্রাকৃতিক সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তরের কার্যকর হাতিয়ার। এগুলি স্থানীয় উৎপাদনকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মূল্য শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত করে, জীবিকা উন্নত করে, পরিষেবা প্রদানের মান বাড়ায় এবং দুর্গম এলাকাগুলিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির করিডরে পরিণত করে।
প্ৰসঙ্গত, আজ যে সব প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলি যথাক্ৰমে - ৯৫৭.৪৬ কোটি টাকার মেঘালয় লজিস্টিকস অ্যান্ড কানেক্টিভিটি ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট, ৫৯.২৯ কোটি টাকার সাপোর্টিং হিউম্যান ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট ইন মেঘালয় (ফেজ-২), ১৩৮.৩৯ কোটি টাকার ইন্টিগ্রেটেড ইকো-ট্যুরিজম অ্যান্ড সাসটেইনেবল অ্যাগ্রি-বেসড লাইভলিহুড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট এবং ৯১.৬০ কোটি টাকার মেঘালয় ইকো-ট্যুরিজম ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট।
এই প্রকল্পগুলির লক্ষ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিদ্যালয় পরিকাঠামো শক্তিশালী করা, টেকসই পর্যটনের প্রসার, জলবায়ু সহনশীল জীবিকা গড়ে তোলা এবং স্থানীয় জনগণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করা।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলির জন্য বিদেশি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্পের সহায়তা ২০০৪-২০১৪ সময়কালের প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা থেকে ২০১৪ সালের পর প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা সাত গুণেরও বেশি বৃদ্ধি। তিনি বলেন, এই পরিবর্তন প্রমাণ করে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে আর দেশের প্রান্তিক অঞ্চল হিসেবে নয়, ভারতের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি, সংযোগ ও সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি, পর্যটন ও লজিস্টিকস ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো, শেষ মাইল ও ডিজিটাল সংযোগ উন্নত করা এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
ইউ সোসো থাম-এর আদর্শ স্মরণ করে অর্থমন্ত্রী নির্মলা বলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে ঐতিহ্যের সঙ্গে উদ্ভাবন, সংরক্ষণের সঙ্গে উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে উদ্যোক্তা মনোভাবের সমন্বয়ে। তিনি বলেন, উন্নত উত্তর-পূর্বাঞ্চল ছাড়া ২০৪৭ সালের উন্নত ভারতের স্বপ্ন পূরণ সম্ভব নয়।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য পেশ করেছেন মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড কঙ্খল সাংমা। তিনি জানান, বর্তমানে মেঘালয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১২,৪৬৬ কোটি টাকার বেশি মূল্যের বিদেশি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি এই রূপান্তরমূলক বিনিয়োগের জন্য ভারত সরকার এবং অর্থ মন্ত্রকের ধারাবাহিক সহযোগিতার প্রশংসা করেছেন।
অনুষ্ঠানে অন্য বিশিষ্টজন ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মেঘালয়ের পশুপালন ও পশুচিকিৎসা মন্ত্রী শানবর শুল্লাই, শিক্ষামন্ত্রী লাখমেন রিম্বুই, পর্যটন মন্ত্রী টিমোথি ডি শিরা, ভারত সরকার ও মেঘালয় সরকারের ঊর্ধ্বতন আধিকারিক, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, প্রকল্পের উপভোক্তা এবং অন্যান্য অংশীজনরা।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস