


- উন্নয়ন-যাত্রায় কোনও জেলা বা কোনও সম্প্রদায়ের পিছিয়ে থাকা উচিত নয়: কেন্দ্ৰীয় অৰ্থমন্ত্ৰী
শিলং, ১৯ জুন (হি.স.) : উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলির উন্নয়নে বিদেশি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলি গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়নের উৎস হিসেবে উঠে এসেছে। এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমে পরিকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, জীবিকা এবং সামাজিক ক্ষেত্রের উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, শিলঙে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন কেন্দ্রীয় অর্থ ও কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ।
আজ শুক্রবার শিলঙে ‘উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিতে বিদেশি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলির (ইএপিস) সদ্ব্যবহার’ শীর্ষক এক সম্মেলনের উদ্বোধন করে বক্তব্য পেশ করছিলেন কেন্দ্রীয় অর্থ ও কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রী নির্মলা। তিনি বলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিপুল উন্নয়ন সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কার্যকর বাস্তবায়ন ক্ষমতা এবং সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের অর্থনৈতিক বিষয়ক বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনে নীতিনির্ধারক, রাজ্য সরকার, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সংস্থা, দ্বিপাক্ষিক সহযোগী সংস্থা এবং উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা একত্রিত হয়েছিলেন। সম্মেলনে বিদেশি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলির কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছয় রাজ্যর মুখ্যমন্ত্রী যথাক্রমে মেঘালয়ের কনরাড কঙ্খল সাংমা, অসমের ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মা, মিজোরামের লালদুহোমা, নাগাল্যান্ডের নেইফিই রিও, সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেমসিং তামাং এবং ত্রিপুরার ডা. মানিক সাহা। এছাড়া ভারত সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের শীর্ষ আধিকারিক, বিশ্ব ব্যাংক, আশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, আশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজিন্সি, নিতি আয়োগ সহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা।
নির্মলা সীতারমণ বলেন, এই সম্মেলন কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সেরা পদ্ধতি ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলিকে আরও কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। অর্থমন্ত্রী বলেন, উত্তর-পূর্ব ভারত উন্নয়নের এমন এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে বিনিয়োগের পাশাপাশি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, বাস্তবায়ন ক্ষমতা এবং অংশীদারিত্ব অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভারতের উন্নয়ন যাত্রার প্রান্তিক এলাকা থেকে মূল স্রোতে উঠে এসেছে এবং ২০৪৭ সালের ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্য পূরণে এই অঞ্চল কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে।
অর্থমন্ত্রী আগামী দিনের উন্নয়নের জন্য আটটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সুসমন্বিত নেতৃত্ব উন্নয়নের গতি বাড়ায় এবং জনগণের আস্থা শক্তিশালী করে। পাশাপাশি কার্যকর পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং পরিষেবা প্রদানের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনসংখ্যাগত শক্তির কথা উল্লেখ করে নির্মলা বলেন, এই অঞ্চলের যুবসমাজ, উদ্যোক্তা শক্তি এবং মহিলা নেতৃত্ব উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। তিনি মানবসম্পদে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নারী নেতৃত্বাধীন উন্নয়নকে অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রগতির ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
উন্নয়ন অর্থায়ন প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বলেন, বহুপাক্ষিক ও দ্বিপাক্ষিক অর্থায়ন শুধুমাত্র অর্থের উৎস নয়, বিশ্বমানের জ্ঞান, উদ্ভাবন এবং সেরা পদ্ধতি গ্রহণের সুযোগও তৈরি করে। রাজ্যগুলিকে বিদেশি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলির মাধ্যমে প্রশাসনিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।
পর্যটন, লজিস্টিকস, কৃষি ব্যবসা, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি, ডিজিটাল পরিষেবা, উৎপাদন শিল্প এবং ‘অরেঞ্জ ইকোনমি’ ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন নির্মলা। তিনি বলেন, এই বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্য সংযোজন এবং টেকসই জীবিকার সুযোগ বাড়াতে পারে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে চলমান বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পরিবহণ পরিকাঠামো, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন মানুষ, বাজার ও সুযোগকে সংযুক্ত করছে এবং ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’-কে আরও শক্তিশালী করছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সমৃদ্ধ পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই অঞ্চল ইকো-ট্যুরিজম, জলবায়ু সহনশীলতা, টেকসই কৃষি এবং সবুজ উন্নয়নের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারে।
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের জন্য সরকার, সমাজ, বিনিয়োগকারী, শিক্ষাক্ষেত্র, নাগরিক সংগঠন এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন। জোর দিয়ে তিনি বলেন, উন্নয়নের যাত্রায় কোনও জেলা বা কোনও সম্প্রদায় পিছিয়ে থাকা উচিত নয়। প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও যাতে দীর্ঘদিন সুফল পাওয়া যায়, সেজন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সম্মেলনে ভারত, বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদেশি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলির বর্তমান কাঠামো নিয়ে কারিগরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অর্থনৈতিক বিষয়ক বিভাগ, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং নীতি আয়োগের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপন করেন।
‘সেরা কার্যক্রম ও পূর্ববর্তী প্রকল্পগুলির অভিজ্ঞতা’ (বেস্ট প্ৰ্যাকটিসেস অ্যন্ড লেসনস ফ্ৰম পাস্ট ইন্টাৰভেনশনস) শীর্ষক অধিবেশনে ত্রিপুরা নগর, পর্যটন ও শিল্প প্রকল্প, আসাম সেকেন্ডারি রোডস ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্প, মণিপুর সমন্বিত জল সরবরাহ প্রকল্প এবং মিজোরামের ফোকাস ২.০ উদ্যোগের মতো সফল প্রকল্পগুলি তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘উত্তরপূর্বের ভবিষ্যৎ এমন কোনও গল্প নয় যা লেখা বাকি আছে, এটি এমন একটি গল্প যা ইতিমধ্যেই গড়ে উঠছে।’
সব পক্ষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সম্ভাবনাকে সমৃদ্ধিতে, যোগাযোগকে সুযোগে, বিনিয়োগকে জীবিকার উৎসে এবং অংশীদারিত্বকে স্থায়ী উন্নয়নে রূপান্তর করতে হবে, যাতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রতিটি প্রান্তে উন্নয়নের সুফল পৌঁছায়।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন মেঘালয় কমিউনিটি অ্যান্ড ল্যান্ডস্কেপ ম্যানেজমেন্ট প্রকল্প, আসাম স্টেট টারশিয়ারি হেলথকেয়ার অগমেন্টেশন প্রকল্প এবং নাগাল্যান্ড বন ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের মতো উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হবে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস