মেঘালয়ে উত্তরপূর্ব ভারতের বৃহত্তম জৈব মশলা প্রক্রিয়াকরণ ইউনিটের উদ্বোধন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলার
- ৩২ কোটি টাকার এই প্রকল্পের মাধ্যমে ৫,৫০০ জন জৈব কৃষকের নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হবে রি-ভোই (মেঘালয়), ১৯ জুন (হি.স.) : মেঘালয়ের রি-ভোইয়ে উত্তরপূর্ব ভারতের বৃহত্তম জৈব মশলা প্রক্রিয়াকরণ ইউনিটের উদ্বোধন করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থ ও কর্পোরেট বিষয়ক
বক্তব্য পেশ করছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ


জৈব মশলা প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট পরিদর্শন


কৃষক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী নির্মলা


- ৩২ কোটি টাকার এই প্রকল্পের মাধ্যমে ৫,৫০০ জন জৈব কৃষকের নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হবে

রি-ভোই (মেঘালয়), ১৯ জুন (হি.স.) : মেঘালয়ের রি-ভোইয়ে উত্তরপূর্ব ভারতের বৃহত্তম জৈব মশলা প্রক্রিয়াকরণ ইউনিটের উদ্বোধন করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থ ও কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ।

মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড কহ্খল সাংমা এবং সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেমসিং তামাং সহ কৃষক, কমিউনিটি লিডার এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে কেন্দ্ৰীয় অৰ্থ মন্ত্ৰী সীতারমন বলেন, বিশ্বজুড়ে যখন ভোক্তারা ক্রমশ উচ্চমানের, টেকসই পদ্ধতিতে উৎপাদিত এবং সহজে শনাক্তযোগ্য কৃষিপণ্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন, তখন মেঘালয়ের একটি বিশেষ প্রাকৃতিক সুবিধা রয়েছে।

তিনি বলেন, কৃষির ভবিষ্যৎ তাঁদেরই, যারা শুধু বেশি নয়, আরও উন্নত, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, অধিকতর অনুসরণযোগ্য (ট্রেসেবল) এবং টেকসই পণ্য উৎপাদন করতে সক্ষম হবেন।

রি-ভোইয়ের উর্বর অঞ্চলে উপস্থিত থাকতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করে নিৰ্মলা বলেন, টেকসই উন্নয়নের ধারণা বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসার বহু আগেই মেঘালয়ের মানুষ এই নীতিকে নিজেদের জীবনের অংশ করে নিয়েছিলেন। মানবকর্মের পরিণতি সম্পর্কে খাসি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃষিক্ষেত্রে এই দর্শনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, কারণ মাটি, জল ও চাষাবাদ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও উৎপাদনশীলতা নির্ধারণ করে।

তিনি বলেন, সম্প্রদায়ভিত্তিক সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ও টেকসই কৃষিচর্চার গভীর সংস্কৃতি মেঘালয়কে প্রিমিয়াম জৈব কৃষির ক্ষেত্রে অগ্রণী রাজ্যে পরিণত করতে পারে। নতুন এই প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রটি প্রমাণ করে, কৃষির ভবিষ্যৎ গুণমান, টেকসইতা, ট্রেসেবিলিটি এবং মূল্য সংযোজনের ওপর নির্ভরশীল।

অর্থমন্ত্রী এই প্রকল্পকে ইস্টার্ন রি-ভোই অর্গানিক ফার্মার প্রডিউসার কোম্পানির প্রায় এক দশকের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের ফল হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ, জনসম্পৃক্ততা এবং ধারাবাহিক সহায়তা কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে, এই প্রকল্প তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

প্রায় ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই জৈব প্রত্যয়িত (অর্গানিক সার্টিফায়েড) কেন্দ্রটি বছরে ১০ হজার মেট্রিক টনের বেশি উচ্চমূল্যের জৈব মশলা প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা রাখে। আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, শুকনো সংরক্ষণাগার, ধোয়া, শুকানো এবং গুঁড়ো করার সুবিধা সহ এই ইউনিটে আদা, হলুদ, গোলমরিচ ও লঙ্কা প্রক্রিয়াকরণ করা হবে।

এটি উত্তরপূর্ব ভারতের প্রথম জৈব প্রত্যয়িত মশলা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র, যা ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ফর অর্গানিক প্রোডাকশন (এনপিওপি) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্গানিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বীকৃত। ফলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রিমিয়াম জৈব বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে মেঘালয় ও সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় ৫,৫০০ জন জৈব কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি, ফসল কাটার পর ক্ষতি হ্রাস, উন্নত সংগ্রহ ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বাজার সংযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে তাঁদের আয় বাড়বে।

মেঘালয়ের উচ্চমানের কৃষিপণ্যের প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, লাকাডং হলুদ, যা ২০২৪ সালে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি পেয়েছে, তাতে সাধারণ বাণিজ্যিক হলুদের তুলনায় অনেক বেশি কারকিউমিন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, মেঘালয়ের আদার জাতগুলি কম আঁশযুক্ত, উচ্চমানসম্পন্ন এবং বাজারে ব্যাপক সম্ভাবনাময়।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, এখন আর কেবল কাঁচামাল রফতানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রস্তুত পণ্য, বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড এবং আন্তর্জাতিক মানের গুণগত পণ্য রফতানির দিকে মনোযোগ দিতে হবে, যাতে মূল্য সংযোজন, কর্মসংস্থান এবং জীবিকা অঞ্চলের মধ্যেই বজায় থাকে।

প্রক্রিয়াকরণ, ব্র্যান্ডিং, প্যাকেজিং, সার্টিফিকেশন এবং বাজারে প্রবেশাধিকারকে তিনি কৃষকদের আত্মনির্ভরতা ও সমৃদ্ধির মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কৃষক ও উৎপাদক সংগঠনের সঙ্গে দৃঢ় সংযোগ গড়ে তোলে এবং ব্র্যান্ডেড খুচরা পণ্য, রফতানি ও ই-কমার্সের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ করে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য পেশ করেছেন মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড কে সাংমা। এই প্রকল্প উদ্বোধনের জন্য কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তিনি। কনরাড বলেন, গত আট বছরে সরকার কৃষকদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পরিকাঠামো উন্নয়ন, বাজার সম্প্রসারণ এবং মূল্য সংযোজনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

তিনি জানান, বর্তমানে মেঘালয় জুড়ে ১১টি প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট চালু রয়েছে, যা প্রায় ৫৫ হাজার কৃষক ও তাঁদের পরিবারকে উপকৃত করছে। ছোট উদ্যোগও কীভাবে গ্রামীণ আয় ও জীবিকায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে, এই প্রকল্পগুলি তার উদাহরণ।

মেঘালয় সরকারের কৃষি ও কৃষক কল্যাণ বিভাগের সচিব বিজয় কুমার ডি বলেন, এই দিনটি মেঘালয়ের ৩.৬ লক্ষ কৃষক পরিবারের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তিনি জানান, এই কেন্দ্রের ফলে অংশগ্রহণকারী কৃষকদের আয় এক মরশুমেই প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

তিনি মেঘালয়ের উদ্ভাবনী কমিউনিটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেলের কথা তুলে ধরেন, যেখানে সরকার বিনিয়োগ সহায়তা দেয়, বেসরকারি অংশীদার প্রযুক্তি ও বাজার সংযোগ নিশ্চিত করে এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মালিকানা ও স্থায়িত্ব বজায় রাখে।

ইস্টার্ন রি-ভোই অর্গানিক ফার্মার প্রডিউসার কোম্পানিতে নয়টি গ্রামের প্রায় ৫০০ জন জৈব কৃষক ২৬টি ফার্মার ইন্টারেস্ট গ্রুপের মাধ্যমে সংগঠিত রয়েছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা সংগ্রহ ও একত্রীকরণ কেন্দ্র, প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট, কোল্ড স্টোরেজ, ভার্মি কম্পোস্ট ইউনিট, কৃষিযন্ত্র ভাড়া কেন্দ্র এবং পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

জৈব মশলা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রটি মিশন অর্গানিক ভ্যালু চেইন ডেভেলপমেন্ট ফর নর্থ ইস্টার্ন রিজিয়ন, মিশন ফর ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট অব হর্টিকালচার, মেঘালয় সরকার এবং ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট-এর সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস




 

 rajesh pande