
বাঁকুড়া, ২৪ জুন (হি.স.) : রাজ্যের নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটেও পূরণ হল না বাঁকুড়ার দীর্ঘদিনের দুই গুরুত্বপূর্ণ দাবি- মন্দিরনগরী বিষ্ণুপুরকে পৃথক জেলা এবং মহকুমা শহর খাতড়াকে পৌরসভা হিসেবে গড়ে তোলা। বাজেটে একাধিক নতুন জেলা, মহকুমা ও পৌরসভার ঘোষণা হলেও বিষ্ণুপুর ও খাতড়ার নাম না থাকায় হতাশা ছড়িয়েছে জেলার বিভিন্ন মহলে।এবারের বাজেটে কলকাতা, বসিরহাট, সুন্দরবন, জঙ্গিপুর ও আরামবাগকে নতুন জেলা হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গোপীবল্লভপুরকে নতুন মহকুমা এবং শিবমন্দির, গাজোল, চাঁচল, বেলদা, বাগনান, জয়গাঁ, কোলাঘাট, কামারপুকুর ও টুঙ্গিদিঘিকে নতুন পৌরসভা গঠনের ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বহুদিনের দাবি থাকা সত্ত্বেও বিষ্ণুপুরকে জেলা বা খাতড়াকে পৌরসভা করার বিষয়ে কোনও ঘোষণা না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।স্থানীয় বাসিন্দা অনুপ কর্মকার, নন্দিতা মালাকার, বসন্ত বোস-সহ অনেকেরই বক্তব্য, ২০২২ সালের অগাস্ট মাসে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নবান্ন থেকে বিষ্ণুপুর-সহ রাজ্যে সাতটি নতুন জেলা গঠনের ঘোষণা করেছিলেন। সেই সময় বিষ্ণুপুরে শাসকদল এবং বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে আনন্দ মিছিলও বের হয়েছিল। পরবর্তীকালে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারেও আবারও বিষ্ণুপুরকে জেলা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু ঘোষণার পর চার বছর কেটে গেলেও আজ পর্যন্ত কোনও সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি হয়নি, প্রশাসনিক স্তরেও কোনও অগ্রগতি দেখা যায়নি।বুধবার বাসিন্দারা অভিযোগ করেন , নতুন জেলার রূপরেখা কী হবে, কোন কোন ব্লক ও পুর এলাকা নিয়ে তা গঠিত হবে, সে বিষয়েও কখনও স্পষ্ট অবস্থান জানানো হয়নি। বিষ্ণুপুর মহকুমার ছয়টি ব্লক ও দুটি পুরসভা নিয়ে জেলা গঠনের সম্ভাবনার কথা শোনা গেলেও তা বাস্তবায়নের পথে এগোয়নি। ফলে এবার সরকার পরিবর্তনের পর নতুন বাজেটে সেই স্বপ্ন পূরণের আশা করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু বাজেটে বিষয়টি স্থান না পাওয়ায় হতাশা আরও বেড়েছে।একইভাবে দীর্ঘদিন ধরেই খাতড়াকে পৌরসভা করার দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় মানুষ। ২০১০ সালের ১৫ জুলাই বামফ্রন্ট সরকার খাতড়াকে পৌরসভা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরে ২০১৪ সালের ১১ জুন তৃণমূল সরকারও একই ঘোষণা করে। কিন্তু আজও সরকারি নোটিফিকেশন জারি না হওয়ায় বাস্তবে খাতড়া পঞ্চায়েতের অধীনেই রয়ে গিয়েছে।বর্তমানে খাতড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ মহকুমা শহর। এখানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে তিনটি কলেজ, চারটি উচ্চ বিদ্যালয়, সাতটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একাধিক সরকারি দফতর, হাসপাতাল, হোটেল, লজ এবং ৬০০-রও বেশি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী শহরের জনসংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৬৩৫। স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে সেই সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে। চাকরি, ব্যবসা ও পড়াশোনার জন্য আশপাশের বহু মানুষ এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন। ফলে নাগরিক পরিষেবার চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।বাসিন্দাদের অভিযোগ, পঞ্চায়েতের সীমিত আর্থিক ক্ষমতার কারণে শহরের পরিকাঠামো উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রাস্তাঘাট, নিকাশি, পানীয় জল, আলোকসজ্জা-সহ একাধিক নাগরিক পরিষেবায় সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। তাঁদের দাবি, পৌরসভা হলে উন্নয়নের জন্য অনেক বেশি অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যেত এবং শহরের পরিকল্পিত সম্প্রসারণ সম্ভব হতো।হোটেল ব্যবসায়ীদেরও বক্তব্য, খাতড়া এখন আর গ্রামাঞ্চল নয়, একটি ক্রমবর্ধমান শহর। কিন্তু পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে শহরের উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না। পৌরসভা হলে পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নাগরিক পরিকাঠামোর আরও উন্নতি সম্ভব হতো।সিপিএমের রাজ্য কমিটির সদস্য তথা স্থানীয় বাসিন্দা অজিত পতি বলেন, বাম সরকারের আমলেই বিধানসভা এবং পরে রাজ্য মন্ত্রিসভায় খাতড়া পৌরসভার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি। তাঁর দাবি, বাম সরকার ক্ষমতায় থাকলে অনেক আগেই খাতড়া পৌরসভা বাস্তবায়িত হতো।এদিকে, বিষ্ণুপুরবাসীরাও মনে করছেন, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও মন্দিরনগরীকে জেলা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি বারবার ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে শুধু প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে কোনও পদক্ষেপ দেখা যায়নি।স্থানীয়দের মতে, এবারের বাজেটে বিষ্ণুপুর জেলা এবং খাতড়া পৌরসভার দাবি উপেক্ষিত হওয়ায় তাঁদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা আবারও অপূর্ণ থেকে গেল। এখন তাঁদের নজর সরকারের পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দিকে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোমনাথ বরাট