
শিলং, ৪ জুন (হি.স.) : শিলঙে অনুষ্ঠিত উত্তরপূর্ব পরিষদ (নর্থ-ইস্ট কাউন্সিল, সংক্ষেপে এনইসি)-এর ৭৩-তম প্ল্যানারি সেশন তথা পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে ত্রিপুরা সহ সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের হাতে এক বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা।
মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিল্পোন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং পরিকাঠামো শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ত্রিপুরার দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রসঙ্গ উত্থাপন করে মুখ্যমন্ত্রী ডা. সাহা জানান, বিনিয়োগবান্ধব নীতির ফলে গত এক বছরে রাজ্য ৩০ হাজার কোটির বেশি টাকার বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। এর মধ্যে ৮ হাজার কোটির বেশি টাকার প্রকল্প ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছেছে। এছাড়া, ত্রিপুরা স্টার্টআপ নীতি ২০২৪-এর অধীনে ২০০-এর বেশি স্টার্টআপ স্বীকৃতি পেয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি আগরতলা-চট্টগ্রাম সরাসরি বিমান পরিষেবা চালুর দাবি জানান। পাশাপাশি উড়ান প্রকল্পের আওতায় কৈলাসহর বিমানবন্দরকে পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা। এছাড়া, বদরপুর-সাব্রুম দ্বৈত-লাইন রেল প্রকল্প দ্রুত শুরু করা, সাব্রুম পর্যন্ত বৈদ্যুতিক যাত্রীবাহী ট্রেন চালু করা এবং আগরতলা-গুয়াহাটি বন্দে ভারত এক্সপ্রেস চালুর দাবি জানিয়েছেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জাতীয় সড়ক পরিকাঠামো উন্নয়ন কর্পোরেশন লিমিটেড (এনএইচআইডিসিএল)-কে সড়ক নির্মাণের গুণমান নিশ্চিত করা ছাড়াও চুড়াইবাড়ি-মুঙ্গিয়াকামি, আগরতলা-উদয়পুর এবং উদয়পুর-অমরপুর করিডরে চার লেনের সড়ক নির্মাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ত্রিপুরার শিল্প প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্যে ৪০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি আগরতলায় একটি এইমস স্থাপনের দাবি জানান ডা. মানিক সাহা।
এছাড়া, প্রধানমন্ত্রী ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ ফর নর্থ ইস্ট প্রকল্পের অধীনে একটি তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক এবং একটি ওয়ার্ল্ড স্কিল সেন্টার অনুমোদনের জন্য ডোনার মন্ত্রকের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ষোড়শ অর্থ কমিশন রাজস্ব ঘাটতি অনুদানের সুপারিশ না করায় ‘প্রাইড অব হিলস’ প্রকল্পের বার্ষিক বরাদ্দ বর্তমান ৩,৪৫০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৬ হাজার কোটি টাকা করার দাবি জানান মুখ্যমন্ত্রী।
আর্থিক বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অর্থমন্ত্রক বহিরাগত সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্প (ইএপি)-এর ক্ষেত্রে ত্রিপুরার অর্থায়নের সর্বোচ্চ সীমা ৪,১৪৬ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে। তিনি এই সীমা বাড়িয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা করার অনুরোধ জানান, যাতে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলির অনুমোদন ও বাস্তবায়ন সহজ হয়।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিনিয়োগ প্রসারে গঠিত উচ্চপর্যায়ের টাস্ক ফোর্সের আহ্বায়ক ও চেয়ারম্যান হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) সাহা আঞ্চলিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি রোডম্যাপও উপস্থাপন করেন। তিনি পণ্য ও পরিষেবা খাতে অগ্রাধিকার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে অধিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কৌশলগত পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন।
অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ভারতের ‘গ্রিন ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। এর জন্য তিনি একটি ‘ইস্টার্ন স্টার্টআপ করিডর’, ‘নর্থ ইস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফ্রি ট্রেড অথরিটি’, সীমান্তভিত্তিক শিল্প ক্লাস্টার কূটনীতি এবং আটটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে ক্যাম্পাস সহ একটি ‘নর্থ ইস্ট স্কিলস ইউনিভার্সিটি’ প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেন।
টেকসই পর্যটনের ওপর গুরুত্বারোপ করে মুখ্যমন্ত্রী সম্প্রদায়ভিত্তিক পর্যটন মডেল এবং সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিনিয়োগ কৌশলের পক্ষে মত দেন, যাতে সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা যায়।
মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহার এই প্রস্তাবনাগুলি ত্রিপুরা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে যোগাযোগ, উদ্ভাবন, টেকসই শিল্প এবং অর্থনৈতিক সুযোগের এক গতিশীল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার একটি সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস