
মুম্বই, ৪ জুন (হি.স.) : বলিউডের বিশিষ্ট প্রযোজক এবং কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র শংসাপত্র বোর্ড (সিবিএফসি)-র প্রাক্তন চেয়ারম্যান পহলাজ নিহালানি আর নেই। বৃহস্পতিবার মুম্বইয়ের নানাবতী হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বলিউডের এই বিশিষ্ট প্রযোজক এবং কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র শংসাপত্র বোর্ড (সিবিএফসি)-এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। সম্প্রতি তাঁর লিভার সিরোসিস ধরা পড়েছিল। তাঁর প্রয়াণের খবরে চলচ্চিত্র জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বৃহস্পতিবার বিকেল তিনটেয় মুম্বইয়ের সান্তাক্রুজ শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা।
১৯৫০ সালে এক সিন্ধি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন পহলাজ নিহালানি। প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বলিউডে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ১৯৮২ সালে ‘হাতকড়ি’ ছবির মাধ্যমে প্রযোজক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। এরপর একের পর এক বাণিজ্যিকভাবে সফল ছবি প্রযোজনা করে তিনি হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে নিজের আলাদা পরিচিতি গড়ে তোলেন। তাঁর প্রযোজনায় নির্মিত ‘ইলজাম’, ‘আগ হি আগ’, ‘শোলা অউর শবনম’, ‘আঁখে’, ‘আন্দাজ’, ‘তলাশ’, ‘রঙ্গিলা রাজা’ এবং ‘জুলি ২’-এর মতো ছবি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। বিশেষ করে ‘আঁখে’ ছবির বিপুল সাফল্য তাঁকে বলিউডের প্রথম সারির সফল প্রযোজকদের তালিকায় নিয়ে আসে।
নতুন শিল্পীদের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও পহলাজ নিহালানির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮৬ সালে ‘ইলজাম’ ছবির মাধ্যমে তিনি গোবিন্দাকে বড় সুযোগ করে দেন। পরবর্তীকালে গোবিন্দা হিন্দি সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় তারকায় পরিণত হন। একইভাবে চাঙ্কি পাণ্ডেকেও বলিউডে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার প্রথম বড় সুযোগ দিয়েছিলেন তিনি। পরে গোবিন্দা-চাঙ্কি জুটির ‘আঁখে’ ছবিটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সফল কমেডি ছবি হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
প্রযোজক হিসেবে সাফল্যের পর ২০১৫ সালে তাঁকে কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র শংসাপত্র বোর্ডের (সিবিএফসি) চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তাঁর কার্যকাল ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর নেতৃত্বে একাধিক চলচ্চিত্রকে ঘিরে সেন্সরশিপ নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। ‘উড়তা পঞ্জাব’, ‘স্পেক্টর’ এবং ‘জব হ্যারি মেট সেজল’-এর মতো ছবির ক্ষেত্রে নেওয়া সিদ্ধান্ত তাঁকে বারবার শিরোনামে নিয়ে আসে।
সেন্সর বোর্ডের প্রধান হিসেবে তাঁর রক্ষণশীল অবস্থান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, “সিবিএফসি-র কাজ শুধু শংসাপত্র দেওয়া নয়, ভারতের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করাও।” সমালোচকদের মতে, এই দৃষ্টিভঙ্গি সেন্সর বোর্ডকে অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগে উৎসাহিত করেছিল এবং চলচ্চিত্রের সৃজনশীল স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছিল।
বিশেষ করে ২০১৬ সালে ‘উড়তা পঞ্জাব’ ছবিকে ঘিরে তাঁর নাম সবচেয়ে বেশি বিতর্কে জড়ায়। মাদক সমস্যাকে কেন্দ্র করে নির্মিত ওই ছবিতে সিবিএফসি বহু কাটছাঁটের নির্দেশ দিলে নির্মাতারা আদালতের দ্বারস্থ হন। বিষয়টি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বনাম সেন্সরশিপের জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত আদালত সীমিত কাটছাঁটের শর্তে ছবিটি মুক্তির অনুমতি দেয়। পরবর্তীকালে ২০১৭ সালে তাঁকে সিবিএফসি প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
তবে তাঁর ঘনিষ্ঠদের মতে, চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সময়মতো শংসাপত্র পাইয়ে দিতে তিনি সবসময়ই আন্তরিক ছিলেন। প্রয়োজনে ছুটির দিনেও চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতেন। চলচ্চিত্র বাণিজ্য বিশ্লেষক অতুল মোহন তাঁর প্রয়াণকে ব্যক্তিগত ক্ষতি বলে উল্লেখ করে বলেন, প্রযোজক ও পরিবেশকদের কাছে পহলাজ নিহালানি ছিলেন অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি। তাঁর সঙ্গে যুক্ত কোনও প্রকল্প সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলেই মনে করা হতো।
চলচ্চিত্র জগতের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গেও তিনি দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। প্রযোজকদের স্বার্থরক্ষায় সরব কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। চলচ্চিত্র শিল্পের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্দ্বিধায় নিজের মতামত প্রকাশ করতেন। তাঁর স্পষ্টভাষী মনোভাব যেমন অনেকের প্রশংসা কুড়িয়েছে, তেমনই বহু বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে।
২০২১ সালে তিনি এক গুরুতর স্বাস্থ্যসঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছিলেন। রক্তবমির পর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং প্রায় ২৮ দিন চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। পরে নিজেই বলেছিলেন, তিনি যেন “মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন”। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনযুদ্ধের মনোভাবকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছিল।
পারিবারিক জীবনেও তিনি ছিলেন সুপরিচিত। স্ত্রী নীতা নিহালানি এবং তিন পুত্রকে রেখে গিয়েছেন তিনি। তাঁর ছেলে চিরাগ নিহালানি সৃজনশীল জগতের সঙ্গে যুক্ত। অভিনেত্রী সোনাক্ষী সিনহা, লাভ সিনহা ও কুশ সিনহা তাঁর আত্মীয়। সোনাক্ষীর মা পুনম সিনহা ছিলেন তাঁর চাচাতো বোন। সেই সূত্রে অভিনেতা ও রাজনীতিক শত্রুঘ্ন সিনহাও তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মধ্যে ছিলেন। বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক ও চিত্রগ্রাহক গোবিন্দ নিহালানি ছিলেন তাঁর বড় ভাই।
পহলাজ নিহালানির জীবন ভারতীয় সিনেমার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সাক্ষী। তিনি যেমন নতুন তারকাদের সুযোগ দিয়েছেন, তেমনই সফল ছবির প্রযোজক হিসেবে দর্শকদের মন জয় করেছেন। আবার সেন্সরশিপ নিয়ে জাতীয় বিতর্কেরও কেন্দ্রে থেকেছেন। প্রযোজক, সংগঠক, প্রশাসক এবং চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব— প্রতিটি ভূমিকাতেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র ছাপ রেখে গিয়েছেন। তাঁর প্রয়াণে হিন্দি চলচ্চিত্র জগৎ এক বিতর্কিত হলেও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বকে হারাল, যার অবদান দীর্ঘদিন স্মরণে থাকবে।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য