

‘উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিতে মাদক পাচার এবং মাদকাসক্তির সমস্যা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে কেন্দ্রীয় সরকার বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে’
শিলং, ৪ জুন (হি.স.) : প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের গত ১২ বছরের শাসনকালে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অসামরিক নাগরিকদের হতাহতের সংখ্যা ৮৬ শতাংশ কমেছে। এ ঘটনা এনডিএ সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য, শিলঙে অনুষ্ঠিত উত্তরপূর্ব পরিষদ-এর ৭৩-তম প্ল্যানারি সেশন তথা পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বলেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি বলেন, ১২টির বেশি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির ফলে এই অঞ্চলে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ গড়ে উঠেছে।
আজ বৃহস্পতিবার মেঘালয়ের রাজধানী শিলঙে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পৌরোহিত্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে উত্তরপূর্ব পরিষদ (নর্থ-ইস্ট কাউন্সিল, সংক্ষেপে এনইসি)-এর ৭৩-তম প্ল্যানারি সেশন তথা পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন।
অধিবেশনে অমিত শাহ বলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিতে মাদক পাচার এবং মাদকাসক্তির সমস্যা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকার নাানাবিধ কৌশল অবলম্বন করে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তিনি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা এবং সেই অধিকার রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে উগ্রবাদ প্রায় অবসানের পথে। এখন রাজ্যগুলির উচিত নিয়মিত ও কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে নতুনভাবে মনোনিবেশ করা। দরিদ্র, নারী এবং শিশুদের অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকার ও প্রশাসনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অমিত শাহ আরও বলেন, নতুন ন্যায় সংহিতার আওতায় প্রত্যেক নাগরিককে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার, ফরেনসিক বিজ্ঞানের বিস্তৃত প্রয়োগ, অনলাইন নিবন্ধন ব্যবস্থা এবং আদালতে অনলাইন সাক্ষ্যগ্রহণের মতো উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
শাহ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালিটিক্স, মেশিন লার্নিং এবং ব্লকচেইনের মতো আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যুবসমাজ অসাধারণ সাফল্য অর্জনের সক্ষমতা রাখে। তিনি সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) শিল্পের একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে জলবিদ্যুৎ ও সৌরশক্তি ক্ষেত্রের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি, এই অঞ্চলে ডেটা সেন্টার শিল্পকে আকৃষ্ট করার জন্যও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া উচিত। শিক্ষা ব্যবস্থা, শিল্পোন্নয়নের কৌশল এবং প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পৌরোহিত্যে অনুষ্ঠিত উত্তরপূর্ব পরিষদের ৭৩-তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে পর্যটন, কৃষি, উদ্যানপালন, বিনিয়োগ প্রসার, দুধ, ডিম, মাছ ও মাংস উৎপাদনে স্বনির্ভরতা, ক্রীড়া উন্নয়ন, অর্থনৈতিক করিডর প্রকল্প, আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ও সংযোগ ব্যবস্থা, হস্ততাঁত ও হস্তশিল্পের প্রসার ইত্যাদি বিষয়গুলিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে বাঁশ ও আগর উন্নয়ন, অষ্টলক্ষ্মী দর্শন প্রকল্প এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়।
এছাড়া, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলির উন্নয়নে গঠিত মুখ্যমন্ত্রী-নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্সগুলির কাজের অগ্রগতি অনুষ্ঠিত অধিবেশনে মূল্যায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি ডোনার অর্থাৎ উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়ন মন্ত্রকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এবং কর্মসূচি সম্পর্কেও পর্যালোচনা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল নর্থইস্ট ইনভেস্টমেন্ট সামিট ও ব্যাংকার্স কনক্লেভের ফলাফল, যুব-কেন্দ্রিক উদ্যোগ, লজিস্টিক্স প্রকল্প, পর্যটন প্রসার এবং অঞ্চলভিত্তিক ইউনিক সেলিং প্রপোজিশন প্রকল্প।
অধিবেশনের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল নর্থইস্ট ভিশন প্ল্যান ২০৪৭। দীর্ঘমেয়াদি এই রূপরেখার লক্ষ্য হলো, ভারতের স্বাধীনতার শতবর্ষে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নত যোগাযোগ, উদ্ভাবন, টেকসই উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করা।
অধিবেশনে এনইসি-র সদস্যরা আঞ্চলিক অগ্রাধিকার বিষয়ক মতামত তুলে ধরার পাশাপাশি আন্তঃরাজ্য সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার সম্ভাব্য উপায়ের ওপর বক্তব্য পেশ করেছেন।
উত্তরপূর্ব পরিষদের ৭৩-তম পূর্ণাঙ্গ বৈঠকে ছিলেন ডোনারমন্ত্রী তথা এনইসি-র উপ-সভাপতি জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া, ডোনার দফতরের প্রতিমন্ত্রী ড. সুকান্ত মজুমদার, আট রাজ্যের রাজ্যপালগণ যথাক্রমে অসমের লক্ষ্মণপ্রসাদ আচার্য, মেঘালয়ের সিএইচ বিজয় শংকর, অরুণাচল প্রদেশের লেফটেন্যান্ট জেনারেল কৈবল্য ত্রিবিক্রম পারনায়েক (অবসরপ্রাপ্ত), মিজোরামের জেনারেল (ড.) বিজয় কুমার সিং (অবসরপ্রাপ্ত), ত্রিপুরার ইন্দ্রসেনা রেড্ডি নাল্লু, নাগাল্যান্ডের নন্দকিশোর যাদব, মণিপুরের অজয় কুমার ভাল্লা, সিকিমের ওম প্রকাশ মাথুর এবং আট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীগণ যথাক্রমে মেঘালয়ের কনরাড কে সাংমা, অসমের ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মা, ত্রিপুরার প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা, নাগাল্যান্ডের নেইফিউ রিও, অরুণাচল প্রদেশের পেমা খান্ডু, মণিপুরের ইউমনাম খেমচাঁদ সিং, মিজোরামের লালদুহোমা ও সিকিমের প্রেম সিং তামাং।
এছাড়া অধিবেশনে ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন, ডোনার মন্ত্রকের সচিব সঞ্জয় জাজু সহ কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের বহু শীর্ষ আধিকারিক।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস