
বাঁকুড়া, ১৭ জুলাই (হি.স.): পশ্চিমবঙ্গে শিল্পবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করে শিল্পপতিদের নির্ভয়ে বিনিয়োগের আহ্বান জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার বাঁকুড়ার মেজিয়া শিল্পাঞ্চলে শ্যাম স্টিল গ্রুপের ইস্পাত কারখানা সম্প্রসারণ প্রকল্পের শিলান্যাস অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে রাজ্যে নতুন শিল্পায়নের পথ খুলে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর।
প্রকল্পের ভূমিপুজো অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ায় শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ৩৪ বছরের বাম শাসনে লাগাতার হরতাল ও শ্রমনীতি রাজ্যের শিল্পোন্নয়নকে ধাক্কা দিয়েছে। পরে তৃণমূল সরকারের সময়ও শিল্পের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর কথায়, শিল্পপতিরা রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছিলেন, শ্যাম স্টিলও ওড়িশায় প্রকল্প নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছিল। তবে রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলেছে।
শ্যাম স্টিল গ্রুপের ১৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগকারীদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সহযোগিতা দেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান। তাঁর হুঁশিয়ারি, কারখানার কাজে বাধা সৃষ্টি বা জোর করে তোলাবাজির কোনও ঘটনা বরদাস্ত করা হবে না। কারখানার গেটে তালা লাগিয়ে উৎপাদন বন্ধ করার চেষ্টা হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জমি সংক্রান্ত নীতির প্রসঙ্গেও তিনি বলেন, অতীতে কৃষকদের কাছ থেকে জোর করে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, আবার পরে শিল্পপতিদের নিজেদের উদ্যোগে জমি কিনতে বলা হয়েছে। তাঁর সরকারের অবস্থান ভিন্ন। শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি সরকারই দেবে এবং বিনিয়োগকারীদের পঞ্চায়েত বা অন্য কোনও স্তরে ঘুরতে হবে না। সচিবালয় থেকেই সমস্ত প্রশাসনিক অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী নাম না করে বিরোধীদের কটাক্ষ করে বলেন, যাঁরা একসময় বহিরাগত তত্ত্বের কথা বলতেন, তাঁদের মেজিয়ার এই শিল্প প্রকল্পে এসে দেশের ঐক্যের ছবি দেখা উচিত। শ্যাম স্টিল কারখানায় যেমন বজরংবলীর মূর্তি ও শিবলিঙ্গ রয়েছে, তেমনই রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতিকৃতি। তাঁর কথায়, এটাই ভারতের প্রকৃত বৈচিত্র্য ও ঐক্যের প্রতীক।
কারখানার শ্রমিকদের 'বিশ্বকর্মা' আখ্যা দিয়ে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, শ্রমিকদের নিষ্ঠা ও পরিশ্রমেই এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান আজকের জায়গায় পৌঁছেছে। কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকার শ্যাম স্টিলের পাশে থাকবে বলেও আশ্বাস দেন।
অনুষ্ঠানে শ্যাম স্টিল গ্রুপের ডিরেক্টর ললিত বেরিওয়ালা জানান, মেজিয়ার ইস্পাত কারখানা সম্প্রসারণে ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, এভিয়েশন, রিয়েল এস্টেট, ফ্যাব্রিকেশন, পেন্টস, কেমিক্যাল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর দাবি, প্রকল্প সম্পূর্ণ হলে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ২০ হাজার এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ১ লক্ষ ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমানে মেজিয়া কারখানায় বছরে দেড় মিলিয়ন টন ইস্পাত উৎপাদিত হয়। সম্প্রসারণের পর তা বেড়ে সাড়ে তিন মিলিয়ন টনে পৌঁছবে। আগামী ছয় বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় বলেন, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে শিল্পোন্নয়নের নতুন অধ্যায় শুরু হবে। তিনি জানান, পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা কমাতে শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। অতীতে যেসব শিল্পপতি রাজ্য ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, তাঁদের ফিরিয়ে আনতেও সরকার উদ্যোগী।
এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, স্বারদ্ব্যত মুখোপাধ্যায়, ক্ষুদিরাম টুডু, দিবাকর ঘরামি, সাংসদ সৌমিত্র খাঁ, শিল্পসচিব বন্দনা যাদব, বাঁকুড়ার জেলাশাসক, পুলিশ সুপার এবং জেলার একাধিক বিধায়ক।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোমনাথ বরাট