শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলা : বীরভূম থেকে বস্তা ভর্তি ঘুষের টাকা পৌঁছাত কলকাতায়, সিবিআই চার্জশিটে চাঞ্চল্যকর তথ্য
কলকাতা, ২ জুলাই (হি. স.) : পশ্চিমবঙ্গের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (সিবিআই) তাদের চূড়ান্ত চার্জশিটে এক বিশাল দুর্নীতির নেটওয়ার্কের পর্দাফাঁস করেছে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, বীরভূম জেলা থেকে একটি কালো রঙের
সিবিআই লোগো


কলকাতা, ২ জুলাই (হি. স.) : পশ্চিমবঙ্গের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (সিবিআই) তাদের চূড়ান্ত চার্জশিটে এক বিশাল দুর্নীতির নেটওয়ার্কের পর্দাফাঁস করেছে।

তদন্তকারী সংস্থার দাবি, বীরভূম জেলা থেকে একটি কালো রঙের স্করপিও গাড়িতে করে বস্তায় ভরে ঘুষের টাকা কলকাতায় পাঠানো হতো। এই বিপুল টাকা তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন বিধায়ক তথা প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের প্রাক্তন সভাপতি মানিক ভট্টাচার্যের ডেরায় পৌঁছাত।

সিবিআই তদন্তে উঠে এসেছে যে, চাকরি দেওয়ার নামে অযোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আদায় করা হতো। বীরভূম জেলার কৃষ্ণপুরের একটি আশ্রমে এই টাকা এবং চাকরিপ্রার্থীদের নথিপত্র জমা করা হতো। সেখান থেকেই বস্তাবন্দি করে সেই টাকা কলকাতায় পাঠানো হতো।

তদন্তকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বীরভূমের নলহাটি-২ ব্লকের তৃণমূল নেতা বিভাস অধিকারী ছিলেন এই পুরো নেটওয়ার্কের মূল এজেন্ট। তিনি মানিক ভট্টাচার্যের হয়ে ঘুষের টাকা সংগ্রহ করতেন। বিভাস অধিকারী ‘অল বেঙ্গল টিচার্স ট্রেনিং অ্যাচিভার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর সহ-সম্পাদক ছিলেন, অন্যদিকে এই মামলার অন্যতম অভিযুক্ত তাপস মণ্ডল ছিলেন ওই সংগঠনের সভাপতি। এই সংগঠনের সাথে একাধিক বেসরকারি বিএড এবং ডিএলএড কলেজের মালিকরাও যুক্ত ছিলেন।

সিবিআই-এর দাবি, বিভাস অধিকারী তাঁর অধীনে সাব-এজেন্টদের এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন। এদের মাধ্যমে শুধু বীরভূমই নয়, উত্তর দিনাজপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদ, হাওড়া এবং পূর্ব মেদিনীপুর সহ একাধিক জেলা থেকে অযোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হতো।

চার্জশিটে বলা হয়েছে, এক এক বারে দুই থেকে তিনটি বস্তায় প্রায় ২০ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা নগদ ভর্তি করে কালো স্করপিও গাড়িতে কলকাতার উদ্দেশ্যে পাঠানো হতো। গাড়িটি ২০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ অতিক্রম করে যাদবপুরে মানিক ভট্টাচার্যের বাড়ি বা কার্যালয়ে পৌঁছাত। তদন্তে পল্লাশ, আপেল, নীলাদ্রি এবং পীযূষ নামের একাধিক এজেন্টের নামও উঠে এসেছে, যার মধ্যে আপেল এই গাড়িটি চালাতেন।

সিবিআই বিভাস অধিকারীর বাড়ি থেকে সবুজ ও লাল রঙের দুটি খাতা (রেজিস্টার) উদ্ধার করেছে। এই খাতাগুলিতে কোন এজেন্ট কোথা থেকে কত টাকা তুলেছে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব লিপিবদ্ধ ছিল। তদন্তে জানা গেছে, প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের নামে ২৪৬ জন প্রাথমিক এবং ৩৩০ জন উচ্চ প্রাথমিক প্রার্থীর কাছ থেকে মোট ৩৫ কোটি ১৯ লক্ষ ১৬ হাজার ৭৩১ টাকা আদায় করা হয়েছে। এই কাজের জন্য ১৬২ জন সাব-এজেন্ট সক্রিয় ছিল।

এছাড়াও লাল খাতাটি থেকে জানা গেছে যে, বিভাস অধিকারী কোনো এজেন্টের সাহায্য ছাড়াই সরাসরি ৮৮ জনের কাছ থেকে ১ কোটি ৯ লক্ষ টাকা নিয়েছিলেন এবং তাঁদের প্রাথমিক শিক্ষক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তদন্তকারী সংস্থা একটি হাতে লেখা চিরকুটেরও সন্ধান পেয়েছে, যেখানে উত্তর দিনাজপুরের আনিসুর রহমানের কাছ থেকে ২ কোটি ৯৮ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা নেওয়ার উল্লেখ রয়েছে।

সিবিআই সূত্রের খবর, ডিএলএড এবং বিএড কলেজগুলিতে অফলাইন রেজিস্ট্রেশনের নামেও পড়ুয়াদের কাছ থেকে বেআইনিভাবে টাকা আদায় করা হতো। কলেজগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, প্রতি ছাত্র পিছু ৫ হাজার টাকা মানিক ভট্টাচার্যের জন্য এবং অতিরিক্ত ১ হাজার টাকা সংগঠনের জন্য আদায় করতে হবে।

উল্লেখ্য, প্রাথমিক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় মানিক ভট্টাচার্যকে আগেই গ্রেফতার করা হয়েছিল। দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসার পর কলকাতা হাইকোর্ট তাঁকে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের সভাপতির পদ থেকে অপসারণ করে। বর্তমানে তিনি জামিনে মুক্ত রয়েছেন।

হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি




 

 rajesh pande