
আগরতলা, ৩১ আগস্ট (হি.স.) : ত্রিপুরা পুলিশ মহানির্দেশকের (ডিজিপি) অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্তকে কেন্দ্র করে সোমবার বিধানসভায় কার্যত বিস্ফোরণ ঘটালেন কংগ্রেস বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মন। ডিজিপি-র লেখা কথিত সুইসাইড নোট উদ্ধার হওয়া এবং সেই নোটের অস্তিত্ব নিয়ে পুলিশের বক্তব্যকে ঘিরে সরাসরি প্রশ্ন তুললেন তিনি। একইসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহার বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ তুলে বিধানসভায় সরব হন কংগ্রেস বিধায়ক। তাঁর বক্তব্যের জেরে বিধানসভায় উত্তেজনা ছড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে এদিনের জন্য বহিষ্কার করেন অধ্যক্ষ রামপদ জমাতিয়া।
বিধানসভা থেকে বহিষ্কারের পর সাংবাদিক সম্মেলন করে আরও বিস্ফোরক দাবি করেন সুদীপ রায় বর্মন। তাঁর অভিযোগ, প্রাক্তন ডিজিপি-র অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী সবকিছু জানেন। এমনকি প্রাক্তন ডিজিপি-র কথিত সুইসাইড নোট কোথায় এবং কে তা লোপাট করেছে, সে সম্পর্কেও মুখ্যমন্ত্রী অবগত বলে দাবি করেন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত প্রাক্তন ডিজিপি-র মৃত্যুর তদন্ত নিয়ে বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া বিবৃতিকে ঘিরে। সুদীপ রায় বর্মনের দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিবৃতিতে প্রাক্তন ডিজিপি-র কোনও সুইসাইড নোটের উল্লেখ ছিল না। অথচ প্রাক্তন ডিজিপি-র স্ত্রী রবিবার রাজ্যে এসে সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিকদের কাছে সুইসাইড নোটের প্রতিলিপি চাওয়ার পর তাঁকে জানানো হয়, এমন কোনও নোট উদ্ধার হয়নি।
কংগ্রেস বিধায়কের দাবি অনুযায়ী, এরপরই প্রাক্তন ডিজিপি-র স্ত্রী জানান, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে তাঁর মোবাইল ফোনে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে একটি সুইসাইড নোট পাঠিয়েছিলেন তাঁর স্বামী। ফলে তদন্তে ওই নোটের অস্তিত্ব এবং সেটি পুলিশের হাতে পৌঁছেছিল কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এই বিষয়টিই সোমবার বিধানসভায় তুলে ধরে সরকারের কাছে স্পষ্টিকরণ দাবি করেন সুদীপ রায় বর্মন। তাঁর বক্তব্য, যদি সত্যিই প্রাক্তন ডিজিপি মৃত্যুর আগে তাঁর স্ত্রীকে সুইসাইড নোট পাঠিয়ে থাকেন, তাহলে পুলিশের তদন্তে সেই নোটের উল্লেখ নেই কেন? নোটটি পুলিশের হাতে পৌঁছেছে কি না, কিংবা পৌঁছে থাকলে সেটির কী হয়েছে—এই প্রশ্নেরও জবাব দাবি করেন তিনি।
বিধানসভায় বিষয়টি নিয়ে জোরালো বক্তব্য রাখতে গিয়ে সুদীপ রায় বর্মন মুখ্যমন্ত্রীর বিবৃতির সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। পরে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, প্রাক্তন ডিজিপি-র মৃত্যু নিয়ে বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী যে বিবৃতি দিয়েছেন তা ‘মিথ্যে’। তাঁর অভিযোগ, পবিত্র বিধানসভায় এমন বিবৃতি দেওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রীর পদে থাকার নৈতিক অধিকার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এরপরই আরও গুরুতর অভিযোগ সামনে আনেন কংগ্রেস বিধায়ক। নিজের বিধায়ক পদ বাজি রেখে তিনি দাবি করেন, প্রাক্তন ডিজিপি-র মৃত্যুর নেপথ্যের সমস্ত বিষয় মুখ্যমন্ত্রীর জানা রয়েছে। এমনকি প্রাক্তন ডিজিপি-র কথিত সুইসাইড নোট কে লোপাট করেছে, সেটিও মুখ্যমন্ত্রী জানেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সুদীপ রায় বর্মনের আরও দাবি, প্রাক্তন ডিজিপিকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়ার ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে দায়ী। তবে তাঁর এই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে এদিন এই অভিযোগের বিষয়ে কী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, সেটিও স্পষ্ট নয়।
এদিকে বিধানসভায় বক্তব্য রাখার সময় নিয়ম-নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগে অধ্যক্ষ সুদীপ রায় বর্মনকে একদিনের জন্য বিধানসভা থেকে বহিষ্কার করেন। বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধীতা করে কংগ্রেস বিধায়ক অভিযোগ করেন, অধ্যক্ষ তাঁর পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাঁকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কার করেছেন।
ডিজিপি-র অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই নানা প্রশ্নের মধ্যে এবার কথিত সুইসাইড নোটের প্রসঙ্গ সামনে আসায় তদন্ত নতুন মাত্রা পেয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সুইসাইড নোটটি আদৌ কোথায়? সেটিতে কী লেখা ছিল? মৃত্যুর আগে হোয়াটসঅ্যাপে স্ত্রীকে পাঠানো কথিত নোটটি তদন্তকারী সংস্থার হাতে রয়েছে কি না? থাকলে সেটি প্রকাশ্যে আসছে না কেন?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখন খুঁজছে বিভিন্ন মহল। বিশেষ করে ডিজিপি-র মৃত্যুর আগে পাঠানো কথিত বার্তা যদি সত্যিই সুইসাইড নোট হয়ে থাকে, তাহলে সেটি তদন্তের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে। ফলে নোটটির অস্তিত্ব, তার বিষয়বস্তু এবং তদন্তকারী সংস্থার কাছে সেটির অবস্থান—সবকিছু নিয়েই স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।
তবে সুইসাইড নোটের বিষয়বস্তু বা সেটি পুলিশের হাতে রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সরকারি বা তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু সোমবার বিধানসভায় সুদীপ রায় বর্মনের বক্তব্যের পর ডিজিপি-র অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্ত যে নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রশ্নের মুখে পড়েছে, তা স্পষ্ট। এখন নজর—কথিত সেই সুইসাইড নোট শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসে কি না এবং তদন্তে তার কী ভূমিকা থাকে।
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ