
দুর্গাপুর, ১৪ সেপ্টেম্বর (হি.স.) : সরকার পরিবর্তন হতেই রাজ্যের প্রাচীন স্থাপত্য সংস্কারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুর্গাপুরের কাঁকসার প্রাচীন মন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম রাঢ়েশ্বর মন্দির। বিগত কয়েক দশক পেরিয়েও আজও অমলিন বাবা রাঢ়েশ্বরের মাহাত্ম্য। আর সেই মন্দিরকে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগী হলেন দুর্গাপুর পূর্বের বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়। নবরূপে সেজে উঠবে গোটা মন্দির চত্বর। তৈরি হলো তার ডিপিআর।
রাঢ়েশ্বর শিবমন্দির। ১৯ নম্বর জাতীয় সড়কের মুচিপাড়া থেকে উত্তর দিকে শিবপুর রোডে ৩-৪ কিলোমিটার দূরে কাঁকসার আড়া মোড়। সেখানেই রয়েছে প্রাচীন এই ঐতিহাসিক শিবমন্দিরটি। রাঢ়েশ্বর শিবমন্দির আড়া শিবতলা নামেও পরিচিত একটি অন্যতম ঐতিহাসিক এবং আধ্যাত্মিক পর্যটন কেন্দ্র। প্রায় ৮৫০ বছর আগে রাজত্ব করতেন রাজা বল্লাল সেন। বল্লাল সেন ছিলেন বঙ্গের সেন রাজবংশের দ্বিতীয় রাজা। ১১৬০ থেকে ১১৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি সেন বংশের রাজত্ব করেন। কাঁকসার মলানদিঘি, বনকাটি সহ আশপাশের কয়েকটি অঞ্চলের মাঝে গড়জঙ্গলে অজয়ের পাড়ে ছিল তাঁর আধিপত্য। কথিত আছে, সেন রাজবংশের অন্যতম শাসক রাজা বল্লাল সেন একসময় এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সেই সময় রাজ্যের নামকরা কবিরাজদের ডাকা হলেও, কেউই তাঁর রোগ সারাতে সক্ষম হননি। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পরও যখন কোনো ফল মেলেনি, তখন রাজা প্রাণপণে দেবাদিদেব মহাদেবের শরণাপন্ন হন। কথিত আছে, স্বয়ং মহাদেবই নাকি তাঁকে স্বপ্নে দর্শন দিয়ে রোগমুক্তির উপায় বলে দেন। এরপরই স্বপ্নাদেশ মেনে দুর্গাপুরের কাঁকসার আড়াতে কালদিঘি পুকুরের পাড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় রাঢ়েশ্বর শিবমন্দির। স্বপ্নাদেশ মতো কালদিঘির জলে স্নান করেন এবং বাবা রাঢ়েশ্বরের পুজো দেন। তারপর তিনি সুস্থ হয়েছিলেন। ওই পুকুরের পাশে বেলে ও মাকড়া পাথর দিয়ে তৈরি করা হয় রাঢ়েশ্বর শিবমন্দিরটি। সেই মন্দিরের ভেতর শিবলিঙ্গ রেখে দেবাদিদেব মহাদেবের আরাধনা শুরু করেন রাজা বল্লাল সেন। মন্দিরটি পূর্ব ভারতের ঐতিহ্যবাহী 'সপ্ত রথ' ও 'নগর স্থাপত্য' শৈলীর এক অনন্য নিদর্শন, যা বেলেপাথর ও ল্যাটেরাইট পাথর দিয়ে তৈরি। এর তীক্ষ্ণ কোণযুক্ত শিখর পর্যটকদের ও স্থাপত্যপ্রেমীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। মন্দিরের গর্ভগৃহে রয়েছে একটি বিশাল আকারের কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ, যা এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ শিবলিঙ্গ হিসেবে পরিচিত। মন্দির প্রাঙ্গণটি শান্ত, স্নিগ্ধ এবং সবুজ গাছপালায় ঘেরা, যা শহুরে কোলাহল থেকে দূরে পর্যটকদের মানসিক শান্তি দেয়। সেই সময় থেকেই ওই স্থানে নিয়মিত পূজার্চনা ও বিশেষ করে সন্ধিক্ষণে শিবপূজার প্রচলন শুরু হয়, যা আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছেন ভক্তরা। শ্রাবণের প্রতিদিনই সকাল থেকেই ভক্তদের ঢল নামে রাঢ়েশ্বর শিবমন্দিরে। কেউ কাঁধে বাঁক নিয়ে, আবার কেউ কলসিতে জল নিয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে মন্দিরে আসেন পুণ্যার্থীরা। শিবরাত্রিতে সকাল থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের ভক্তদের আনাগোনা শুরু হয়। সকাল থেকেই চলে পুজো পাঠ। শিবলিঙ্গে জল ঢেলে অনেকে মনের ইচ্ছে জানান ভগবানকে। শিবরাত্রি এবং চৈত্র সংক্রান্তির সময় এখানে মেলা বসে এবং মন্দিরটিকে চমৎকারভাবে সাজানো হয়। রাঢ়েশ্বর শিবমন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থানই নয়, অসংখ্য ভক্তের আস্থা ও বিশ্বাসের কেন্দ্রস্থলও। দুর্গাপুরের প্রাচীন মন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম রাঢ়েশ্বর মন্দির। বিগত কয়েক দশক পেরিয়েও আজও অমলিন বাবা রাঢ়েশ্বরের মাহাত্ম্য।
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন হয়েছে এলাকার। গড়ে উঠেছে অনেক বহুতল, বেড়েছে জনসংখ্যা। সেই ভিড়ের মাঝে আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে সেন আমলের ঐতিহ্যবাহী বল্লাল সেনের তৈরি সেই মন্দির। প্রাচীন এই মন্দিরটিকে ঘিরে সুন্দর পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগী হয়েছেন দুর্গাপুর পূর্বের বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়। ইতিমধ্যে প্রায় ৪ কোটি টাকার ডিপিআরও তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন, কী কী তৈরি হবে?
জানা গেছে, মন্দির চত্বরে ২.৬৬ ডেসিমল জমি রয়েছে। সেখানে তৈরি হবে সুসজ্জিত প্রবেশদ্বার। তৈরি হবে অতিথিশালা, পুণ্যার্থীদের জন্য বিশ্রামাগার। কমিউনিটি স্যানিটারি কমপ্লেক্স। যানবাহন পার্কিং এলাকার উন্নয়ন। মন্দির চত্বর পেভার ব্লক দিয়ে তৈরি করা হবে।
পার্শ্ববর্তী পুকুর পুনঃখনন এবং পুকুর পাড় সুরক্ষা ও সৌন্দর্যায়ন। বৈদ্যুতিক হাই মাস্ট ও রাস্তার ওপর লাগানো হবে পথবাতি। ৩০টি স্টল করা হবে। মন্দির চত্বর চারদিকে ঘিরে দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে ৩ কোটি ৭০ লক্ষ টাকার বাজেট তৈরি করা হয়েছে। সেই রিপোর্ট কাঁকসা ব্লক প্রশাসন ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছে। বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, রাঢ়েশ্বর দুর্গাপুরবাসীর আবেগ। সারা বছরই রাজ্য ছাড়াও ভিন রাজ্য থেকে পুণ্যার্থীরা আসেন। তাই সেই মন্দিরটিকে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করা হবে। নতুন করে সাজিয়ে তোলা হবে। প্রজেক্ট রিপোর্ট তৈরি হয়ে গেছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / জয়দেব লাহা