- শহিদ মঙ্গল পাণ্ডের পূৰ্ণাবয়ব মূর্তির আবরণ উন্মোচন মুখ্যমন্ত্রীর
- ‘সিপাহি বিদ্রোহে বরাক উপত্যকার যথেষ্ট অবদান আছে, সাক্ষী শ্ৰীভূমির লাতু-মালেগড়’
- শিলচরে আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরে শুরু হবে প্রস্তাবিত উড়ালপুলের নির্মাণকাজ
শিলচর (অসম), ৩১ আগস্ট (হি.স.) : ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্ৰামের, ঐতিহাসিক ১৮৫৭ সালে সংগঠিত সিপাহি বিদ্রোহের প্রথম অমর শহিদকে সম্মান জানিয়ে আজ রবিবার শিলচরের ঘুঙ্গুর-মেহেরপুর রিংরোড পয়েন্টে বীর-সেনানি মঙ্গল পাণ্ডের পূৰ্ণাবয়ব মূর্তির আবরণ উন্মোচন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা।
এ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে অমর শহিদ মঙ্গল পাণ্ডের উদ্দেশ্যে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মুখ্যমন্ত্রী ড. শর্মা। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাথমিক আধারস্বরূপ সিপাহি বিদ্রোহ এবং তার পূর্ববর্তী বিদ্রোহগুলি ব্রিটিশ ঔপনিবেশকতার বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রাথমিক প্রতিরোধ হিসেবে আমাদের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। সংগঠিত সংগ্রামগুলিতে আমাদের বহু বীর-সেনানি শহিদ হয়েছিলেন। তাঁরা দেশবাসীর কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন, স্বাধীনতা আমাদের জন্মস্বত্ব অধিকার, আমাদের সকলকে সম্মিলিতভাবে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বলেন, ওই সকল মহান সেনানিদের আত্মবলিদানের ফসল স্বরূপ আজ আমরা স্বাধীন ভারতের নাগরিক। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অবদান আমাদের কখনও বিস্মৃত হওয়া উচিত নয়, বলেন মুখ্যমন্ত্রী।
অমর শহিদ মঙ্গল পাণ্ডের জীবন এবং কর্মকাণ্ডের বর্ণনা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ১৮২৭ সালে অধুনা উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদের সুরহোরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মঙ্গল পাণ্ডে। ১৮৪৯ সালে মাত্ৰ ২২ বছর বয়সে তিনি ৩৪ নম্বর বেঙ্গল ন্যাটিভ ইনফ্রেনট্রি-তে যোগদান করেছিলেন। ১৮৫৭ সালে প্রথমবারের মতো সেনাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল ব্যতিক্রমী বন্দুক। এই বন্দুকে ব্যবহৃত কর্তুজ দাঁত দিয়ে খুলতে হতো। তখন প্রচার করা হয়, ওই কার্তুজগুলিতে গরু এবং শূকরের চর্বি মিশ্রিত আছে। এ ঘটনাকে সেনারা মেনে নিতে পারেননি। তাঁরা তাঁদের ধর্মীয় পবিত্রতা নষ্ট করার ষড়যন্ত্র বলে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন।
১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ বিকালে ব্যারাকপুরের সেনা ছাউনির প্যারেড ফিল্ডে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন মঙ্গল পাণ্ডে। অসীম সাহসের বলে তিনি মেজর জেনারেল হিউসন এবং লেফট্যানান্ট বাগের মতো প্রথমসারির সেনা-আধিকারিকের সঙ্গে তরোয়াল-যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েন। বিচার পর্বে তিনি এ ঘটনার জন্য কোনও অনুতাপ প্রকাশ না করে উল্টে কাঠগড়া থেকে স্বীকারোক্তি দিয়ে ফের বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ফলস্বরূপ মঙ্গল পাণ্ডেকে বিদ্রোহী বলে দোষী সাব্যস্ত করে ব্রিটিশ শাসক তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। ১৯৫৭ সালের ৮ এপ্রিল ব্যারাকপুরে মাত্র ৩০ বছর বয়সে দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন উৎসৰ্গ করেছিলেন মঙ্গল পাণ্ডে।
মঙ্গল পাণ্ডের ফাঁসির ঠিক পর-পর কীভাবে গোটা দেশে সিপাহিদের বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছিল সে প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই বিদ্রোহে বরাক উপত্যকারও যথেষ্ট অবদান আছে। এর সাক্ষী শ্ৰীভূমি জেলা সদরের উপকণ্ঠ লাতুর মালেগড়। ড. শর্মা বলেন, ১৮৫৭ সালের নভেম্বর মাসে চিটাগাঙে (অধুনা বাংলাদেশ) নিয়োজিত ৩৪ নম্বর বেঙ্গল ন্যাটিভ ইনফ্রেনট্রি রেজিমেন্টের তিনটি কোম্পানি বিদ্রোহ করেছিল। ওই সালের ১৮ ডিসেম্বর সকালে বিদ্রোহী দলটি লাতু পর্যন্ত অগ্রসর হয়। লাতুর মালেগড়ে ব্রিটিশ সেনার সঙ্গে বিদ্রোহী ওই দলের প্রচণ্ড গুলি বিনিময় হয়। গোলাগুলিতে কম করেও ২৬ জন বিদ্রোহী-সিপাহি শহিদ হয়েছিলেন। তবে পাঁচজন (৫) ইংরেজ সেনার মৃত্যু হয়েছিল আমাদের সিপাহিদের গুলিতে।
এ ঘটনার পর ২৪ ডিসেম্বর মোহনপুরের জঙ্গলে রণটিলায়ও সিপাহিরা অসীম বীরত্বের সঙ্গে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। সিপাহি বিদ্রোহ কেবল কাছাড় তথা বরাক উপত্যকার জন্যই নয়, সমগ্র অসমের জন্য এক গৌরবময় বীরগাঁথা হয়ে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে জ্বল-জ্বল করছে।
এছাড়া বরাক উপত্যকার চা শ্রমিকদের ‘মুলুক চলো’ আন্দোলনও ব্রিটিশের বিরুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ জাগরণ ছিল বলে বর্ণনা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সিপাহি বিদ্রোহ এবং মুলুক চলো আন্দোলনে বরাক উপত্যকার বিদ্রোহীরা যে আত্মবলিদান দিয়েছিলেন, সে সব ইতিহাস আমাদের সর্বদা মনে রাখা উচিত।
সিপাহি বিদ্রোহে বরাক উপত্যকার অনন্য অবদানকে স্মরণ করে এই বিদ্রোহের প্রথম শহিদ মঙ্গল পাণ্ডের পূর্ণাবয়ব মূর্তি শিলচরে স্থাপন করাকে একেবারে সমুচিত বলে ব্যাখ্যা করেছেন ড. শর্মা। বরাক উপত্যকার জনসাধারণ তাঁর মূর্তি স্থাপন করতে দীর্ঘদিন ধরে প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন বলে রাজ্যবাসীর পক্ষ থেকে এই কার্যের নেপথ্যে যে সকল ব্যক্তি আছেন তাঁদেরকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন মুখ্যমন্ত্ৰী হিমন্তবিশ্ব শর্মা। তিনি বলেন, আজ বরাক উপত্যকার কাছে অতি বিশেষ দিন, কেননা আজ একই দিনে শিলচরে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং অমর শহিদ মঙ্গল পাণ্ডের পূর্ণাবয়ব মূর্তির আবরণ উন্মোচিত হয়েছে।
কয়েকদিন পর আবার শিলচরে আসবেন বলে মুখ্যমন্ত্রী জানান, শিলচরবাসীকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্যাপিটাল পয়েন্ট থেকে রাঙ্গিরখাড়ি পর্যন্ত ৭০০ কোটি টাকা ব্যায়সাপেক্ষে প্রস্তাবিত উড়ালপুল তৈরি হবে। আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরে প্রস্তাবিত ওই উড়ালপুলের নির্মাণকার্যের শুভারম্ভ হবে এবং কাজ সম্পূর্ণ করার সময়সীমা ধাৰ্য করা হয়েছে প্রায় আড়াই বছর। দু-একমাসের মধ্যে সরকার এজন্য ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু করবে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। শিলচর শহরকে যানজট-মুক্ত করার লক্ষ্যে উড়ালপুল নিৰ্মাণকালে সৃষ্ট অসুবিধায় নাগরিকদের সহযোগিতা কামনা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
আজকের এই অনুষ্ঠানে ‘মহাক্রান্তিকারী মঙ্গল পাণ্ডে’, ‘শ্রীমন্ত শংকরদেব ও মাধবদেব’ এবং ‘এক্সপ্লোরিং দ্য ভিজন অব পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়’ শীর্ষক তিনটি বইয়ের আবরণ উন্মোচন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী ড. শর্মা।
অনুষ্ঠানে অন্য হাজারো গণ্যমান্য নাগরিক-জনতার ছাড়াও ছিলেন খাদ্য, অসামরিক সরবরাহ ও ভোক্তা বিষয়ক মন্ত্রী কৌশিক রায়; পশুচিকিৎসা ও পশুপালন মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল; তিন সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য, কৃপানাথ মালাহ ও কণাদ পুরকায়স্থ; পাঁচ বিধায়ক দ্বীপায়ন চক্ৰবৰ্তী, মিহিরকান্তি সোম, বিজয় মালাকার, নীহাররঞ্জন দাস, কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ; প্রাক্তন সাংসদ মিশনরঞ্জন দাস; মঙ্গল পাণ্ডে মূর্তি স্থাপন সমিতির চেয়ারম্যান উদয়শংকর গোস্বামী, জেলাশাসক, পুলিশ সুপার সহ প্রশাসনিক উচ্চপদস্থ ও পদস্থ আধিকারিকবৰ্গ।
এর পর মুখ্যমন্ত্রী ড. শর্মা ঐতিহাসিক শিলচর টেনিস ক্লাব পরিদর্শনে গিয়ে প্রশিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময় করে এর পরিকাঠামোগত সুবিধার খোঁজখবর নিয়েছেন। রাজ্যে টেনিসকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে শিলচর টেনিস ক্লাবের ভূমিকার তথ্য টেনে বক্তব্য পেশ করেছেন তিনি। এখান থেকে মুখ্যমন্ত্রী সদ্য প্রয়াত প্রাক্তন সাংসদ কমলেন্দু ভট্টাচার্যের বাড়ি গিয়ে তাঁর শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কিছু সময় কাটিয়েছেন।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস