
কলকাতা, ৯ অক্টোবর (হি.স.) :
পশ্চিমবঙ্গের দুই প্রান্তে দুই অ্যাপ-ক্যাব চালককে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার মাত্র তিন দিনের মাথায় তার কিনারা করার দাবি করল চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেট। ডানকুনিতে ক্যাব চালক খুনের ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে একটি সুসংগঠিত গাড়ি চোর চক্রের হদিশ পায় পুলিশ এবং এই ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে মোট তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতরা জেরায় ডানকুনি তো বটেই, এমনকি কলকাতার এন্টালি থানা এলাকায় অপর এক ক্যাব চালক হত্যার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছে। ধৃতদের আদালতে তোলা হলে বিচারক তাদের পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত তিন অভিযুক্তের নাম মহম্মদ মনিরুল গাজী, শেখ শাহাদত এবং মহম্মদ আরিয়ান মোল্লা। ধৃতদের মধ্যে মনিরুল ও শাহদত মধ্যমগ্রামের এবং আরিয়ান নিমতার বাসিন্দা।
তদন্তকারী আধিকারিকদের প্রাথমিক অনুমান, দুটি হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেই অপরাধীরা একই ধরনের অপরাধমূলক কৌশল বা মডাস অপারেন্ডি ব্যবহার করেছিল। উভয় ক্ষেত্রেই আক্রান্ত চালকের পা নাইলনের দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে এবং গলায় ফাঁস লাগিয়ে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়েছে।
প্রথম ঘটনাটি ঘটে গত ৫ অক্টোবর সকালে। ওই দিন সকালে ডানকুনি থানা এলাকার দিল্লি রোডের ভাদুওয়া মোড়ের কাছে এক ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে উদ্ধার করে শ্রীরামপুর ওয়ালবার্গ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। নিহত ওই ব্যক্তির নাম রামজেশ কাদি (৫৮), যিনি উত্তর দমদমের বাঁকারার বাসিন্দা এবং পেশায় একজন অ্যাপ-ক্যাব চালক ছিলেন।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় মর্মান্তিক ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে গত বুধবার সকালে। কলকাতার এন্টালি থানা এলাকার ডিসি দে রোডে রাস্তার ধারে পার্ক করা একটি তালা বন্ধ ক্যাবের ভেতর থেকে ভগবান প্রসাদ গুপ্ত নামের এক ক্যাব চালকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। রামজেশের মতোই তাঁরও পা নাইলনের দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টেও শ্বাসরোধ করে খুনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়।
চন্দননগর কমিশনারেটের গোয়েন্দা প্রধান অভিযোজিত সেনগুপ্তর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে এই জটিল মামলার তদন্ত শুরু হয়। ক্লোজ সার্কিট টিভি ফুটেজ এবং নিখুঁত প্রযুক্তিগত নজরদারির সাহায্য নিয়ে পুলিশ শেষপর্যন্ত ওই তিন অভিযুক্তকে জালে তুলতে সক্ষম হয়। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের পর গাড়ি চুরি এবং জোড়া খুনের এই ভয়ংকর রহস্য প্রকাশ্যে আসে।
পুলিশের কাছে জেরায় ধৃতরা জানিয়েছে যে, গত ৪ অক্টোবর রাতে তারা কোনো অ্যাপের মাধ্যমে নয়, বরং সরাসরি ভাড়া ঠিক করে বিমানবন্দর এলাকা থেকেই রামজেশের ক্যাবটি বুক করেছিল। এরপর রাতের অন্ধকার ও মহাসড়কের নির্জন অংশ পেয়ে গাড়ির পেছনে বসা অভিযুক্তরা চালককে অতর্কিতে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। চালক অচেতন বা মৃত হয়ে যাওয়ার পর পাশের আসনে বসা ব্যক্তিটি চলন্ত গাড়ির মধ্যেই হ্যান্ডব্র্রেক টেনে গাড়ি থামায় এবং ড্রাইভিং সিট দখল করে নেয়। এরপর মৃত চালকের পা চলন্ত গাড়ির সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে ডানকুনি ভাদুওয়া মোড়ের কাছে চলন্ত গাড়ি থেকেই রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়া হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় অভিযুক্তরা আরও জানায় যে, তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্যাবটি চুরি করে অবৈধ বাজারে বিক্রি করে মোটা টাকা কামানো। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা রামজেশের ট্যাক্সি নিয়ে বেনিিয়াপুকুরে পৌঁছায়। কিন্তু গাড়ির প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র না থাকা এবং মাঝপথে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ায় তারা ক্রেতা বা অন্য কাউকে জোগাড় করতে পারেনি। ফলে বাধ্য হয়ে তারা ওই গাড়িটি বেনিিয়াপুকুরেই ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।
পুলিশের মতে, প্রথম পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল না হওয়ায় ওই চক্রটি পরবর্তীতে এন্টালিতে ভগবান প্রসাদ গুপ্তকে নিজেদের পরবর্তী টার্গেট বানায় এবং একই কায়দায় তাঁকে খুন করে। ডানকুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়ে দুই ঘটনার মধ্যে চরম সাদৃশ্য খুঁজে পায় পুলিশ। এরপর ধৃতদের কড়া ও ম্যারাথন জেরা করতেই শুক্রবার রাতে তারা এন্টালির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে নেয়। জোড়া খুনের এই ঘটনায় এলাকায় চরম চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সন্তোষ মধুপ