(রাউন্ড আপ) নকশালমুক্তির পর বস্তরে পুনর্বাসন ও উন্নয়নে জোর, একাধিক কর্মসূচির খতিয়ান তুলে ধরলেন অমিত শাহ
দান্তেওয়াড়ায় সেবা সংকল্প অভিযানের দ্বিতীয় পর্যায়, জগদলপুরে প্রথম শিবিরে উপকৃত ৩,৬০০-রও বেশি দিব্যাঙ্গ; আত্মসমর্পণ, কর্মসংস্থান, পরিকাঠামো ও জনজাতীয় সংস্কৃতির প্রসঙ্গও উঠে এল
‘সেবা সংকল্প অভিযান’-এ নকশাল হিংসায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, দান্তেওয়াড়ার শিবিরে অমিত শাহের ভার্চুয়াল মাধ্যমে যোগদান


রায়পুর, ১৫ অক্টোবর (হি.স.): নকশালবাদের অবসানের পর হিংসায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন এবং বস্তর অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের ওপর জোর দিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বৃহস্পতিবার ছত্রিশগড়ে ‘সেবা সংকল্প অভিযান’-এর অধীনে দান্তেওয়াড়ায় আয়োজিত বিনামূল্যের দিব্যাঙ্গ সহায়ক সরঞ্জাম বিতরণ শিবিরের দ্বিতীয় পর্যায়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যোগ দিয়ে তিনি বলেন, নকশাল হিংসায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকে সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপনের সুযোগ করে দেওয়াই সরকারের সংকল্প। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার চলতি বছরের ৩১ মার্চের মধ্যে দেশ থেকে নকশালবাদ নির্মূল করার সংকল্প নিয়েছিল। তাঁর দাবি, এখন দেশে নকশালবাদ নির্মূল হয়েছে। একই সঙ্গে বস্তর অলিম্পিক, বস্তর পাণ্ডুম, আত্মসমর্পণকারী নকশালদের পুনর্বাসন এবং নকশাল প্রভাবিত এলাকায় সরকারি পরিষেবা সম্প্রসারণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন তিনি।

নিজের সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে অমিত শাহ জানান, নকশালদের আইইডি বিস্ফোরণে হাত-পা হারানো নিরীহ মানুষকে কৃত্রিম অঙ্গের সাহায্যে পুনরায় স্বনির্ভর করে তোলার উদ্যোগ চলছে। গত ৫ থেকে ৭ অক্টোবর জগদলপুরে আয়োজিত প্রথম পর্যায়ের শিবিরে ৩,৬০০-রও বেশি দিব্যাঙ্গ ব্যক্তি উপকৃত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বস্তর জেলা থেকেই ১,৫৭০ জন ছিলেন।

আইইডি বিস্ফোরণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গ

অমিত শাহ বলেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইইডি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিরীহ মানুষকে দিব্যাঙ্গ করে দেওয়াকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নকশালবাদের অবসান ঘটানোই যথেষ্ট নয়। গত পাঁচ দশকের হিংসায় যাঁরা হাত-পা, দৃষ্টিশক্তি কিংবা শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন, তাঁদের জীবনে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে হবে।

এই উদ্দেশ্যে কৃত্রিম হাত-পা, হুইলচেয়ার, ট্রাইসাইকেল, ক্রাচ, শ্রবণযন্ত্র, স্মার্ট ওয়াকিং স্টিক এবং অন্যান্য সহায়ক সরঞ্জাম দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অমিত শাহ ছত্তীসগঢ়ের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেও সাই ও উপমুখ্যমন্ত্রী বিজয় শর্মাকে এই কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রাজ্য সরকারের যেখানে সহায়তার প্রয়োজন হবে, সেখানে কেন্দ্রীয় সরকার পাশে থাকবে।

আত্মসমর্পণকারী নকশালদের পুনর্বাসন

আত্মসমর্পণকারী নকশালদের পুনর্বাসনের বিভিন্ন পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮,৫২৬ জন নকশাল আত্মসমর্পণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে ৭,৫০০ জনের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। ১,৬২৫ জনকে পুরস্কারের অর্থ এবং ৭,৮৮২ জনকে উৎসাহভাতা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

এ ছাড়া ৪৫৫ জনকে চাকরি, ১২৯ জনকে জমি এবং ৪,০১৪ জনকে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার আওতায় বাড়ি দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। ২,৩০০-রও বেশি আদিবাসীকে দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান অমিত শাহ।

রেশন, বিদ্যুৎ ও পরিকাঠামোয় উন্নয়নের দাবি

নকশাল প্রভাবিত এলাকায় সরকারি পরিষেবা সম্প্রসারণের প্রসঙ্গে অমিত শাহ জানান, ৬,৭০০টি নতুন রেশন কার্ড তৈরি হয়েছে এবং ২,৮০০টি পরিবারকে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৪৮,৫২৬ জনকে আধার কার্ড দেওয়া, ৩৭২টি নতুন সড়ক প্রকল্পের কাজ শুরু এবং ৬৭০টি কুয়ো নির্মাণের কথা উল্লেখ করেন তিনি। পঞ্চায়েত পর্যায়ে উন্নয়নমূলক উদ্যোগের জন্য পুরস্কার দেওয়ার প্রসঙ্গও উঠে আসে।

অমিত শাহ বলেন, নকশাল প্রভাবিত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে যে ঘাটতি ছিল, তা পূরণ করতে হবে। আবাসন, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, রেশন এবং দক্ষতা উন্নয়নের মতো পরিষেবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া উন্নয়ন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নিরাপত্তা শিবিরকে জনসেবামূলক কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, নকশাল প্রভাবিত এলাকায় ৫০০-রও বেশি নিরাপত্তা শিবির তৈরি করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২০০-রও বেশি শিবিরকে জনসেবামূলক কেন্দ্রে রূপান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি বক্তব্যে উল্লেখ করেন।

তাঁর মতে, এই কেন্দ্রগুলির মাধ্যমে শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা, যুবকদের কর্মসংস্থান এবং আদিবাসীদের সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করা হবে। কৃষকদের ধান সংগ্রহের ব্যবস্থার দিকেও নজর দেওয়ার কথা বলেন তিনি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান এবং সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়াই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।

বস্তর অলিম্পিক ও বস্তর পাণ্ডুমে নতুন পরিচয়

বস্তরের সামাজিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গে অমিত শাহ বস্তর অলিম্পিক ও বস্তর পাণ্ডুমের উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, একসময় যেখানে গুলি ও বোমার বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যেত, সেখানে এখন হাজার হাজার যুবক বস্তর অলিম্পিকে অংশ নিচ্ছেন। অন্যদিকে, বস্তর পাণ্ডুমের মাধ্যমে জনজাতীয় শিল্পকলা ও সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি ‘নিয়দ নেল্লানার’ যোজনার কথাও উল্লেখ করেন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে নকশাল প্রভাবিত এলাকায় মৌলিক পরিকাঠামো এবং সরকারি পরিষেবা সম্প্রসারণের কাজ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বক্তব্যে বস্তরের ঐতিহ্যবাহী জনজাতীয় নেতৃত্বের অবদানের কথাও উল্লেখ করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পুনর্বাসন কর্মসূচিতে ছত্রিশগড়ে সরকার, জেলা প্রশাসন, সমাজকল্যাণ দফতর, ভগবান মহাবীর বিকলাঙ্গ সহায়তা সমিতি এবং ভারতীয় জৈন সংঘ-সহ বিভিন্ন সহযোগী সংস্থার ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি।

নকশালবাদের অবসানের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ

অমিত শাহের বক্তব্যে নকশালমুক্তির পরবর্তী পর্যায়ে পুনর্বাসন, সরকারি পরিষেবা সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক উন্নয়নের বিষয়গুলি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে নকশালবাদ নির্মূলের সংকল্প পূরণ হয়েছে। এবার হিংসায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা এবং বস্তরকে শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও উন্নত অঞ্চলে পরিণত করাই লক্ষ্য।

নকশাল হিংসায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন থেকে শুরু করে আত্মসমর্পণকারীদের মূলস্রোতে ফেরানো, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং জনজাতীয় সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন—বক্তব্যে এই সমস্ত বিষয়কে একই বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

---------------

হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য




 

 rajesh pande