তিন শরিকের দুর্গাপুজো; বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়িতে আরাধনা হয় শালগ্রাম শিলা ও দেবী মনসার
সৌম্যজিৎ চক্রবর্তী হাওড়া, ১৫ অক্টোবর (হি.স.): একই পরিবারের তিন শরিকের বাড়িতে পৃথকভাবে পূজিত হন দেবী দুর্গা। তিন পুজোরই নিয়ম উপাচার এক। শতাব্দী প্রাচীন এই পারিবারিক পুজোকে কেন্দ্র করে যেমন একাত্ম হয় তিন বাড়ির সদস্যরা, তেমনই একত্রিত হয় গোটা গ
বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির প্রতিমা


সৌম্যজিৎ চক্রবর্তী

হাওড়া, ১৫ অক্টোবর (হি.স.): একই পরিবারের তিন শরিকের বাড়িতে পৃথকভাবে পূজিত হন দেবী দুর্গা। তিন পুজোরই নিয়ম উপাচার এক। শতাব্দী প্রাচীন এই পারিবারিক পুজোকে কেন্দ্র করে যেমন একাত্ম হয় তিন বাড়ির সদস্যরা, তেমনই একত্রিত হয় গোটা গ্রাম। হাওড়ার ডোমজুড় মাকড়দহের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার। এলাকায় তিন শরিকের পুজো খ্যাত বড়বাড়ি, মনসাতলা এবং নতুনবাড়ি হিসেবে।

স্থানীয় ইতিহাস থেকে জানা যায়, একসময় এই পরিবারের দুর্গাপুজো হতো হুগলির বাগান্ডায়। মুঘল সাম্রাজ্য তখন শেষের পথে। ব্রিটিশ রাজত্ব শুরু হতে দেরি আরও বেশ কিছু বছর। দেশের শাসনব্যবস্থায় তখন এক অরাজকতা। বর্গিবাহিনী মাঝে মাঝেই হানা দিচ্ছে বাংলার গ্রামেগঞ্জে। বর্গি হানার আশঙ্কায় ১৭৪২ সালে বাগান্ডায় নিজের ভিটেমাটি ছাড়লেন জগদীশ বাচস্পতি। উত্তর প্রদেশের কনৌজ (কান্যকুব্জ) থেকে বাংলায় আসা শাস্ত্রজ্ঞ কুলীন ব্রাহ্মণদের অন্যতম তাঁরা। পদবি বন্দ্যোপাধ্যায় হলেও তাঁদের উপাধি ছিল বাচস্পতি। বাগান্ডা ছেড়ে সপরিবারে সরস্বতী নদীর ধারে মাকড়দহে এসে উপস্থিত হন তিনি। স্থানীয় বাসিন্দারা এই ব্রাহ্মণ পরিবারকে তাঁদের গ্রামে থেকে যাওয়ার অনুরোধ করেন। করবিহীনভাবে বেশ কিছু জমি দেওয়া হয় বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারকে। সেই সময় এই অঞ্চলের নাম ছিল নোয়াপাড়া বা ন'পাড়া। নোয়া পাড়ার পূর্বমুখী অবস্থানের জন্য পরবর্তীকালে নাম হয়ে যায় পূর্বান্নপাড়া। এখানেই এখন মাকড়দহের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের বাস।

পরিবারের তিন শরিক বাড়িরই পুজোর উপাচার একই। বৃহৎ নন্দীকেশ্বর পুরাণ অনুযায়ী শাক্ত মতে হয় দেবীর আরাধনা। জগদীশ বাচস্পতি আরাধ্য অনন্তদেবের শালগ্রাম শিলাকে বাগান্ডা থেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন মাকড়দহে। পারিবারিক দুর্গোৎসবের অন্যতম অংশ অনন্তদেব। পুজোর চারদিন অনন্তদেব শালগ্রাম শিলাকে নিয়ে যাওয়া হয় তিন শরিকের বাড়িতেই। তিনি পুজিত হন তিন বাড়িরই দুর্গা-প্রাঙ্গণে।

এই পরিবারের নতুনবাড়ির সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, প্রাচীনকালে সন্ধি পুজোর আগে কামান ফাটানো হতো। এমনকি সন্ধি পুজোর পাঁঠা বলির (এখন সেই প্রথা বন্ধ) আগেও মোট দুবার কামান দাগা হতো। পুজোয় দেবীকে দেওয়া হয় চার রকমের ভোগ, যথাক্রমে সাদা ভোগ, খেচরান্ন (খিচুড়ি), লুচি ভোগ ও ঘি-ভাত। প্রাচীনকাল থেকেই দেবীর পুজো হয়ে আসছে ষোড়শোপচারে। প্রতিপদ থেকে নবমী প্রতিদিন হয় একরূপ চণ্ডীপাঠ। বিশেষ প্রথা হিসেবে নবমীর দিন এই বাড়িতে হয় মনসা পুজো। কথিত আছে, “দেবী মনসার স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী এই বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের কারওর কোনওদিন সর্প দংশনে মৃত্যু হবেনা।”

গ্রামের প্রাচীন রীতি অনুযায়ী শোভাযাত্রা সহকারে দেবীকে ভাসান দেওয়া হয় দশমীর সন্ধ্যায়, সরস্বতী নদীতে। আর একাদশীর বিকেলে প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী এলাকার সব দুর্গাপুজোর আয়োজক ও উদ্যোক্তারা একত্রে পুজো দেন গ্রামের আরাধ্য দেবী মাকড়চন্ডীর মন্দিরে। সেখানেও পুজো করা হয় ষোড়শোপচারে।

হিন্দুস্থান সমাচার / সৌম্যজিৎ




 

 rajesh pande