নৌকা পুজোর প্রাচীন রেওয়াজ কুন্ডুচৌধুরীদের দুর্গোৎসবে
সৌম্যজিৎ চক্রবর্তী হাওড়া, ১৪ অক্টোবর (হি.স.): মৌড়ির কুন্ডুচৌধুরী বাড়িতে বছরে দু''বার দুর্গোৎসবের রেওয়াজ। বসন্তে আরাধনা বাসন্তীর, আর শরতে পুজো হয় পার্বতীর। দেখতে দেখতে সেই পুজোর বয়সও হয়ে গেল প্রায় ৩ শতকের কাছাকাছি। স্থানীয় ইতিহাসের তথ্য
কুন্ডুচৌধুরী বাড়ির ঠাকুরদালান, নিজস্ব চিত্র


সৌম্যজিৎ চক্রবর্তী

হাওড়া, ১৪ অক্টোবর (হি.স.): মৌড়ির কুন্ডুচৌধুরী বাড়িতে বছরে দু'বার দুর্গোৎসবের রেওয়াজ। বসন্তে আরাধনা বাসন্তীর, আর শরতে পুজো হয় পার্বতীর। দেখতে দেখতে সেই পুজোর বয়সও হয়ে গেল প্রায় ৩ শতকের কাছাকাছি।

স্থানীয় ইতিহাসের তথ্য থেকে জানা যায়, সেকালে কুন্ডুচৌধুরীদের জমিদারি ছিল হাওড়া, হুগলি, মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান ও দুই ২৪ পরগনায়। সে সময় এই বাড়ির পাশ দিয়েই বয়ে যেত খরস্রোতা সরস্বতী নদী। সেই জলপথকে কাজে লাগিয়েই প্রাচীনকালে বাণিজ্য করতে যেতেন পরিবারের সদস্যরা। দুর্গম, বিপদসঙ্কুল নদীপথে নানা বিপদের আশঙ্কা রয়েই যেত। বাণিজ্যে যাওয়া এই পরিবারের সদস্যদের ও তাঁদের সঙ্গের নৌকাগুলোকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে কুন্ডুচৌধুরী বাড়িতে শুরু হয় দেবীর আরাধনা। বসন্তকালে 'বাসন্তী পুজো'র পর তাঁরা রওনা হতেন বাণিজ্যে। আর বাণিজ্য সেরে নিরাপদে বাড়ি ফিরলে শরৎকালে হতো অকালবোধন দুর্গাপুজো। আজও সেই আরাধনার অঙ্গ হিসেবে নিয়ম মেনে দশমীতে হয়ে চলেছে বুট পুজো (নৌকার ইংরেজি বোট শব্দের অপভ্রংশ হয়ে এমন নাম)। একে নৌকা উপযোগ অনুষ্ঠানও বলা হয়। খরস্রোতা সরস্বতী নদীতে পলি জমে এখন তা ক্ষীণকায়। নদীপথের বাণিজ্যও সেই কবেই বিলুপ্ত হয়েছে। কিন্তু নৌকা পুজোর রেওয়াজ এ বাড়িতে রয়ে গেছে আজও।

পরিবারের সদস্য শ্রীকুমার কুন্ডুচৌধুরী বলেন, এই পরিবারে সারাবছর ধরেই বিভিন্ন পূজার্চনা হয়। সেসব পালনের জন্য প্রাচীনকাল থেকেই পরিবারের সদস্যদের দ্বারা রচিত 'অর্পণ নামা'-য় পুজোর বিভিন্ন নিয়মবিধি লেখা আছে। এই জমিদার পরিবারের প্রাসাদের পাশেই রয়েছে জোড়া শিব মন্দির। বছরভর পুজো হয় সেখানেও। এই পরিবারে দেবীর স্বরূপ মহিষমর্দিনী নয়, পূজিতা হন শান্তিদায়িনী হরগৌরী রূপে। এখানে ষাঁড়ের পিঠে আসীন দেবাদিদেব, শিবের কোলে মা দুর্গা। দেবীর সঙ্গে সরস্বতী, লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক থাকলেও, মহিষাসুর ও সিংহ থাকে না।

উল্টোরথের দিনই পুজো প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় এ বাড়িতে। নিয়ম মেনে সেদিনই প্রতিমার কাঠামো তৈরির জন্য বাঁশ কাটা হয়। আর মহালয়ার পরের দিন অর্থাৎ প্রতিপদ থেকে নিত্য নিয়ম মেনে হয় চণ্ডীপাঠ। বাড়ির ঠাকুরঘরে লক্ষ্মী-জনার্দনের কাছে পঞ্চমী পর্যন্ত হয় পঞ্চমী পুজো, ষষ্ঠীতে বেলতলা পুজো আর বোধন। সাধারণত, অন্যান্য বনেদি বাড়িতে একদিন কুমারী পুজো হলেও, এখানে সপ্তমী থেকে দশমী টানা চারদিন কুমারী পুজো হয়। বৈষ্ণব মতে পুজো হয় দেবীর। তাই কোনওরকম পশুবলির রীতি নেই। তবে প্রথা অনুযায়ী বাতাবি লেবু বলি হয়। কিন্তু তাও প্রকাশ্যে নয়, লোকচক্ষুর অন্তরালে। পুজোর একদিন হরিনাম সংকীর্তন বসে এই বাড়িতে। অষ্টমীতে পরিবারের সধবা মহিলারা ধুনো পোড়ান। নবমীর সন্ধ্যা থেকে শুধুমাত্র পরিবারের বিবাহিত মহিলারাই কাঠের একটি প্রতীকী নৌকাকে সেযুগের ব্যবসায় ব্যবহৃত কড়ি, মুদ্রা, সিঁদুর, নতুন গামছা দিয়ে সাজিয়ে বিশেষ স্থানে রেখে দেন। দশমীর দিন সেটি পুজোর পর পুনরায় ঠাকুর ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দেওয়া হয়। আবার মাস ছয়েক পরে বাসন্তী পুজোর নবমীর দিন সেই প্রতীকী নৌকোটি সাজানো হয় পুজোর জন্য।

হিন্দুস্থান সমাচার / সৌম্যজিৎ




 

 rajesh pande