সময় বদলেছে, বদলায়নি শাস্ত্রীয় বিধান: হাফলঙের জগন্নাথ মন্দিরের দুর্গাপুজো ১১৫ বছরের প্রাচীন মন্দিরে শতাব্দীপ্রাচীন পরম্পরার ধারাবাহিকতা, আধুনিকতার জাঁকজমক থেকে দূরে আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয় দুর্গোৎসব
হাফলং (অসম) ১৪ অক্টোবর (হি স): সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে দুর্গাপুজো উদ্যাপনের ধরন। বর্ণময় আলোকসজ্জা, থিমের বৈচিত্র্য, আধুনিক মণ্ডপসজ্জা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন আজ দুর্গোৎসবের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। কিন্তু অসমের অন্যতম পাহাড়ি
Joggonath mondir


হাফলং (অসম) ১৪ অক্টোবর (হি স): সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে দুর্গাপুজো উদ্যাপনের ধরন। বর্ণময় আলোকসজ্জা, থিমের বৈচিত্র্য, আধুনিক মণ্ডপসজ্জা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন আজ দুর্গোৎসবের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। কিন্তু অসমের অন্যতম পাহাড়ি জেলা ডিমা হাসাওয়ের সদর শহর হাফলঙে এমন একটি মন্দির রয়েছে, যেখানে আধুনিকতার জাঁকজমকের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় শাস্ত্রীয় বিধিবিধান, ধর্মীয় অনুশাসন এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে।

বাংলা ১৩১৮ সাল, ইংরেজি ১৯১২ সালে ঢাকা বিক্রমপুরের তেওটিয়া নিবাসী প্রয়াত হরচন্দ্র দাসের স্মৃতিতে হাফলং শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জগন্নাথ মন্দির। ১১৫ বছরের প্রাচীন এই মন্দিরে আজও প্রচলিত রীতিনীতি মেনেই অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে দুর্গাপুজো। শতাধিক বছরের এই পুজো পাহাড়ি শহরটির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

শতাধিক বছরের পরম্পরা

হাফলং শহরের প্রাচীন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে অন্যতম জগন্নাথ মন্দির। দীর্ঘদিন ধরেই এই মন্দির স্থানীয় বাঙালি সমাজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মন্দিরটির ১১৫ বছরের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে রয়েছে একাধিক প্রজন্মের মানুষের বিশ্বাস, ভক্তি ও স্মৃতি।

এই মন্দিরে দুর্গাপুজো শুধুমাত্র কয়েক দিনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পুজোর সঙ্গে যুক্ত মানুষজন শাস্ত্রীয় বিধিবিধান ও প্রচলিত আচার-অনুষ্ঠানকে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। সময়ের পরিবর্তন ঘট hiলেও পুজোর মূল ধর্মীয় কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখার এই প্রচেষ্টাই জগন্নাথ মন্দিরের দুর্গোৎসবকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি।

আধুনিকতার ভিড়েও প্রাচীন রীতির সংরক্ষণ

বর্তমান সময়ে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে থিমভিত্তিক মণ্ডপ, চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা, অভিনব প্রতিমা এবং বড় আকারের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পুজোর সঙ্গে বিনোদন, পর্যটন ও জনসমাগমের বিষয়টিও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শহর থেকে মফস্সল—সর্বত্রই দুর্গোৎসব উদ্যাপনে আধুনিকতার প্রভাব স্পষ্ট।

তবে হাফলঙের জগন্নাথ মন্দিরের দুর্গাপুজোর বৈশিষ্ট্য কিছুটা আলাদা। এখানে পুজোর মূল আকর্ষণ বাহ্যিক জাঁকজমক নয়, বরং শাস্ত্রীয় বিধি মেনে দেবীর আরাধনা। পুজোর আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মীয় রীতিনীতি এবং প্রচলিত বিধানকে প্রাধান্য দিয়েই এই উৎসবের আয়োজন করা হয়।

এর অর্থ এই নয় যে সময়ের সঙ্গে সমাজের কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। বরং পরিবর্তনশীল সামাজিক পরিবেশের মধ্যেও মন্দিরের পুজোয় প্রাচীন ধর্মীয় পরম্পরা অক্ষুণ্ণ রাখার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ধারাবাহিকতাই জগন্নাথ মন্দিরের দুর্গোৎসবকে অন্যান্য অনেক পুজোর তুলনায় স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।

পুজোর মূল কেন্দ্রে শাস্ত্রীয় বিধিবিধান

দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার, মন্ত্রোচ্চারণ, পুজোপদ্ধতি ও নির্দিষ্ট বিধিবিধান। প্রচলিত রীতি অনুসারে পুজোর প্রতিটি পর্যায়ের নিজস্ব ধর্মীয় তাৎপর্য রয়েছে। জগন্নাথ মন্দিরের দুর্গাপুজোয় এই শাস্ত্রীয় পরম্পরাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পালন করা হয়।

বর্তমান সময়ে পুজোর বাহ্যিক আয়োজন নিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেখা যায়। এমন পরিস্থিতিতে এই মন্দিরের পুজো দুর্গোৎসবের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের কথা মনে করিয়ে দেয়—ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুশাসনের ধারাবাহিকতা।

এখানে উৎসবের সাফল্য শুধুমাত্র মণ্ডপের সৌন্দর্য, আলোকসজ্জার আড়ম্বর কিংবা দর্শনার্থীর সংখ্যার নিরিখে বিচার করা হয় না। পুজোর ধর্মীয় তাৎপর্য বজায় রাখা এবং পরম্পরা অনুসারে দেবীর আরাধনা করাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখার ক্ষেত্রে মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়ম মেনে পুজোর আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাঁরা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছেন।

হাফলঙের বাঙালি সমাজের আবেগ ও সম্প্রীতির কেন্দ্র

পাহাড়ি জেলা ডিমা হাসাওয়ের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল বিভিন্ন ভাষা, জনগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। এই বৈচিত্র্যের মধ্যে দুর্গাপুজো বাঙালি সমাজের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব। হাফলঙের জগন্নাথ মন্দিরের পুজো সেই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

দীর্ঘদিন ধরে মন্দিরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মানুষের আবেগ, পারিবারিক স্মৃতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাস এই পুজোর গুরুত্ব বাড়িয়েছে। এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের মধ্যে পুজোর রীতিনীতি ও পরম্পরা প্রবাহিত হওয়ার মধ্য দিয়ে মন্দিরটি শুধুমাত্র উপাসনাস্থল হিসেবেই নয়, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্ব অর্জন করেছে।

দুর্গোৎসবের সময় ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সামাজিক সম্পর্কও আরও নিবিড় হয়। সেই দিক থেকে জগন্নাথ মন্দিরের দুর্গাপুজো হাফলঙের সামাজিক জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ঐতিহ্য সংরক্ষণই স্বতন্ত্র পরিচয়

সময়ের সঙ্গে উৎসবের রূপ বদলানো স্বাভাবিক। আধুনিক প্রযুক্তি, আলোকসজ্জা কিংবা নতুন ধরনের আয়োজন দুর্গাপুজোকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের মধ্যেও প্রাচীন রীতিনীতি ও ধর্মীয় পরম্পরা সংরক্ষণের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

হাফলঙের জগন্নাথ মন্দিরের দুর্গাপুজো সেই ঐতিহ্য সংরক্ষণেরই একটি নিদর্শন। ১১৫ বছরের প্রাচীন মন্দিরে শতাধিক বছর ধরে চলে আসা দুর্গোৎসব আজও শাস্ত্রীয় বিধিবিধানকে কেন্দ্র করেই অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বাহ্যিক জাঁকজমকের প্রতিযোগিতা থেকে দূরে থেকে ধর্মীয় আচার ও পরম্পরাকে প্রাধান্য দেওয়ার এই প্রচেষ্টাই মন্দিরের পুজোকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

অতীতের ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে বর্তমানের পথে এগিয়ে চলা—হাফলঙের জগন্নাথ মন্দিরের দুর্গাপুজো যেন সেই বার্তাই বহন করে। সময় বদলেছে, উৎসব উদ্যাপনের ধরনও বদলেছে। কিন্তু বিশ্বাস, নিষ্ঠা এবং শাস্ত্রীয় বিধিবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা যে আজও একটি উৎসবের মূল পরিচয় হয়ে থাকতে পারে, তারই সাক্ষ্য বহন করছে পাহাড়ি শহর হাফলঙের এই প্রাচীন দুর্গোৎসব।

হিন্দুস্থান সমাচার / বিশাখা দেব




 

 rajesh pande