ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে ষড়যন্ত্র, বিপদে সেই নেতারাই আবার আশ্রয় নিলেন ভারতে!
কিশোর সরকার ঢাকা, ১৫ অক্টোবর (হি.স.): চীনের প্ররোচনায় ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আওয়ামী লীগের একশ্রেণির প্রভাবশালী নেতা এখন রাজনৈতিক পালাবদলে আশ্রয় নিয়েছেন খোদ ভারতেই। অভিযোগ উঠেছে, ভারতের স্পর্শকাতর নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্
বিপদে সেই নেতারাই আবার আশ্রয় নিলেন ভারতে!


কিশোর সরকার

ঢাকা, ১৫ অক্টোবর (হি.স.): চীনের প্ররোচনায় ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আওয়ামী লীগের একশ্রেণির প্রভাবশালী নেতা এখন রাজনৈতিক পালাবদলে আশ্রয় নিয়েছেন খোদ ভারতেই। অভিযোগ উঠেছে, ভারতের স্পর্শকাতর নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য চীনের হাতে তুলে দিতে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভুল পথে পরিচালিত করতে সরকারের অন্দরেই একটি বিশেষ সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর সেই সিন্ডিকেটের সদস্যদের বড় অংশই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গিয়ে ওঠেন। তাঁদের অনেকে প্রথমে ভারতে গেলেও পরবর্তীকালে পরিবার নিয়ে কানাডা, ব্রিটেন, আমেরিকা, দুবাই, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়ায় চলে যান বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে। তবে ভারতে থাকা নেতাদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ ও দলীয় বৈঠকের সূত্রে তাঁদের অনেকেই মাঝেমধ্যে কলকাতা ও দিল্লিতে আনাগোনা করছেন বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনস্থ ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন আবহাওয়া দপ্তরগুলির রাডার ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছিল একটি চীনা সরকারি সংস্থার হাতে। আশ্চর্যজনকভাবে, ভারতীয় সীমান্তবর্তী স্টেশনগুলির যন্ত্রপাতি মেরামত করা হলেও বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পটুয়াখালীর সমুদ্র উপকূলীয় কলাপাড়া রাডারটি মেরামত করেনি চীনা সংস্থাটি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আবহাওয়া দপ্তরের এক শীর্ষ কর্তা জানান, মূলত সাধারণ আবহাওয়া রাডারের আড়ালে ভারতের ওপর সামরিক নজরদারি চালাতেই এই ফাঁদ পেতেছিল চীন। একইভাবে ভৌগোলিক দিক থেকে ভারতের মেঘালয় সীমান্তের কাছে অবস্থিত লালমনিরহাট বিমানবন্দরের রাডার পরিচালনার কাজও চীনের হাতে সঁপে দিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।

এখানেই শেষ নয়; ভারতের কৌশলগত 'চিকেনস নেক' করিডোরের কাছাকাছি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া সড়কের পাশে স্থানীয় সাংসদকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে ২০২৩ সালে 'নর্থ পয়েন্ট মেডিক্যাল কলেজ' নামে এক হাজার শয্যার একটি হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু করে চীন। এই প্রকল্পের অনুকূলে স্থানীয় কিছু মানুষকে দিয়ে মানববন্ধনের আয়োজনও করায় চীনা সংস্থাটি। অভিযোগ, চিকিৎসার আড়ালে এটি আসলে ছিল চীনের একটি সামরিক গবেষণাগার। তৎকালীন চীনা রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতিতে হাসপাতালটির উদ্বোধন করিয়ে নেওয়া হয়েছিল তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিকে দিয়ে।

একইভাবে আসাম বিমানবন্দর এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপত্তার স্বার্থে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত সিলেট বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের বরাতও ভারতের আপত্তি উড়িয়ে চীনা সংস্থার হাতে তুলে দেয় আওয়ামী লীগ সরকার।

অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনার সরকারের অন্দরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, সামরিক সচিব প্রয়াত মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন, বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়া, প্রাক্তন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু চীনের সঙ্গে এই বিতর্কিত চুক্তিগুলো সম্পাদনে সরাসরি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে প্ররোচিত করেছিলেন। নেপথ্যে থেকে এই পুরো সিন্ডিকেটের সুতো নাড়তেন প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান।

একই কায়দায় ভারতের নিরাপত্তার জন্য সংবেদনশীল মোংলা সমুদ্র বন্দরের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে তুলে দিতে প্রভাব খাটিয়েছিলেন প্রাক্তন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের একাধিক সূত্রের দাবি, এর বিনিময়ে চীনের থেকে বিপুল অঙ্কের আর্থিক সুবিধা লাভ করেছিলেন তিনি। তবে সরকার পতনের পর সেই খালিদ মাহমুদ চৌধুরীও প্রথমে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে পাড়ি জমান লন্ডনে; বর্তমানে সেখানেই পরিবারের সঙ্গে বহাল তবিয়তে অবস্থান করছেন তিনি।

এর পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের সম্পদ অনুসন্ধানের অজুহাতে ২০২২ সালে চীনের প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রকের অধীনস্থ 'ফার্স্ট ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফি'-র সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রবীণ অধ্যাপক জানান, গভীর সমুদ্রের সম্পদ নিয়ে গবেষণা করার মতো নিজস্ব পরিকাঠামো বা জাহাজ বাংলাদেশের নেই; এই প্রযুক্তি রয়েছে আমেরিকা, রাশিয়া বা চীনের মতো পরাশক্তিগুলির কাছে। তাঁর মতে, গবেষণা নিছক একটি অজুহাত মাত্র—প্রকৃত লক্ষ্য ছিল বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণে চীনের আধিপত্য কায়েম করা।

উল্লেখ্য, বঙ্গোপসাগরে নিজের অবস্থান পোক্ত করতে ২০১৩ সালেই বাংলাদেশের কাছে দুটি পুরোনো সাবমেরিন বিক্রি করেছিল বেইজিং। সেই সূত্রে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির উদ্দেশ্যে ২০১৭ সালে কক্সবাজারের পেকুয়ায় নির্মিত হয় একটি পূর্ণাঙ্গ সাবমেরিন ঘাঁটি। রক্ষণাবেক্ষণের অজুহাত দেখিয়ে চীনা সামরিক বিশেষজ্ঞরা সেখানে কার্যত স্থায়ী আস্তানা গড়ে তোলেন।

জানা গেছে, কথিত 'জাতীয় স্বার্থের' দোহাই দিয়ে সরকারের এই সিন্ডিকেট প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিনিয়ত বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন করত। চীনের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নিয়েই তারা এই কার্যকলাপ চালাত বলে অভিযোগ। তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরও চিত্রটি সম্পূর্ণ বদলায়নি। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, ক্ষমতার পালাবদলের সুযোগে বর্তমান বিএনপির একটি অংশও পূর্বতন আওয়ামী লীগ সরকারের পথ অনুসরণ করে ভারতের নিরাপত্তার পক্ষে উদ্বেগজনক এই ধরনের কার্যকলাপে মদত দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

---------------

হিন্দুস্থান সমাচার / সংবাদ




 

 rajesh pande