
আগরতলা, ২৭ অক্টোবর (হি.স.) : পেশায় টমটম চালক। প্রতিদিন যাত্রী পরিষেবা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করাই তাঁর কাজ। কিন্তু সেই দৈনন্দিন জীবনের মধ্যেই সততা ও মহানুভবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন রাজধানীর টাউন প্রতাপগড় এলাকার বাসিন্দা গৌতম সাহা। নিজের টমটমে যাত্রীর ফেলে যাওয়া স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা ও অন্যান্য সামগ্রীভর্তি একটি ব্যাগ উদ্ধার করে এক মুহূর্ত দেরি না করে তিনি তা তুলে দিলেন পূর্ব আগরতলা থানার পুলিশের হাতে। গৌতম সাহার এই সততা ও মানবিকতায় মুগ্ধ পুলিশ আধিকারিক থেকে শুরু করে ই-রিকশা শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
বর্তমান সময়ে হারিয়ে যাওয়া মূল্যবান সামগ্রী ফিরে পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। বিশেষ করে গণপরিবহণে যাতায়াতের সময় অসাবধানতাবশত কোনও যাত্রী নিজের মূল্যবান জিনিসপত্র ফেলে গেলে তা ফিরে পাওয়ার আশা অনেকেই প্রায় ছেড়েই দেন। কিন্তু সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন টমটম চালক গৌতম সাহা। তাঁর কাছে সততা যে কেবল কথার বিষয় নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের নৈতিক দায়িত্ব, তা নিজের কাজের মধ্য দিয়েই প্রমাণ করলেন তিনি।
ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে গৌতম সাহা জানান, লক্ষ্মীপুজোর দিন দুপুরে জনৈক মহিলা তাঁর টমটমে করে লাল বাহাদুর চৌমুহনী এলাকা থেকে রাধানগরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। টমটমে ওঠার সময় ওই মহিলার হাতে একটি লাল রঙের ব্যাগ ছিল বলে তাঁর মনে রয়েছে। প্রথমে মহিলা রাধানগরের একটি মন্দিরে যাওয়ার কথা বললেও পরে রাধানগর বাজারের সামনে নেমে বামুটিয়া যাবেন বলে জানান। সেখানেই তিনি টমটম থেকে নেমে যান। কিন্তু অসাবধানতাবশত নিজের লাল ব্যাগটি সঙ্গে নিতে ভুলে যান।
অন্যদিকে, যাত্রী নামানোর পর টমটম চালক গৌতম সাহাও বিষয়টি খেয়াল করতে পারেননি। লক্ষ্মীপুজোর দিন সারাক্ষণ টমটম চালিয়ে যাত্রী পরিষেবা দেওয়ার পর সন্ধ্যায় তিনি বিশালগড়ের উদ্দেশে রওনা হন। এরপর সোমবার আগরতলায় ফিরে এসে ফের সারাদিন যাত্রী পরিবহণের কাজে ব্যস্ত থাকেন। এভাবেই টমটমের পিছনের সিটে পড়ে থাকে ওই মহিলার ব্যাগটি।
সোমবার রাতে নিজের টমটম পরিষ্কার করার জন্য উদ্যোগী হন গৌতম সাহা। সেই সময়ই পিছনের সিটে পড়ে থাকা লাল রঙের ব্যাগটি তাঁর নজরে আসে। ব্যাগটি খুলে তার মধ্যে স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা এবং অন্যান্য সামগ্রী রয়েছে বলে জানতে পারেন তিনি। মূল্যবান সামগ্রী থাকা সত্ত্বেও সেগুলি নিজের কাছে রেখে দেওয়ার কোনও চেষ্টা না করে সঙ্গে সঙ্গেই বিষয়টি তাঁর সিন্ডিকেটের নেতৃবৃন্দকে জানান।
এরপর মঙ্গলবার সকাল ১১টা নাগাদ সিন্ডিকেটের নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে পূর্ব আগরতলা থানায় পৌঁছান গৌতম সাহা। সেখানে পুলিশ আধিকারিকদের হাতে ব্যাগটি তুলে দেন তিনি। এদিন পূর্ব আগরতলা থানায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে গোটা ঘটনার বিবরণ দেন টমটম চালক।
গৌতম সাহার এই পদক্ষেপে স্বাভাবিকভাবেই প্রশংসায় পঞ্চমুখ পূর্ব আগরতলা থানার পুলিশ আধিকারিক এবং ই-রিকশা শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তাঁদের বক্তব্য, সততা, নিষ্ঠা ও মহানুভবতার মাধ্যমে গৌতম সাহা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা সমাজের কাছে অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা বহন করে। পেশা কিংবা আর্থিক অবস্থান নয়, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর নৈতিকতা ও মূল্যবোধের মধ্যেই ফুটে ওঠে—গৌতম সাহার কাজ যেন সেই বার্তাই আরও একবার স্পষ্ট করে দিল।
শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ রাজ্যের অন্যান্য টমটম চালকদেরও এই ধরনের সততা ও দায়িত্ববোধ বজায় রেখে কাজ করার আহ্বান জানান। তাঁদের মতে, গণপরিবহণের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সংস্পর্শে আসেন। তাঁদের সামান্য সতর্কতা, দায়িত্বশীলতা ও মানবিক আচরণ সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস আরও দৃঢ় করতে পারে।
জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন রাস্তায় নেমে যাত্রী পরিষেবা দেওয়া গৌতম সাহার কাছে হয়তো এটি ছিল নিজের কর্তব্য পালন মাত্র। কিন্তু তাঁর এই কাজ সমাজের সামনে এক বড় শিক্ষা রেখে গেল। মূল্যবান স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিজের কাছে রাখার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সেগুলি প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে তিনি প্রমাণ করলেন, সততা এখনও হারিয়ে যায়নি। বরং সাধারণ মানুষের মধ্যেই তা নীরবে বেঁচে রয়েছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ