
কলকাতা, ২৮ অক্টোবর ( হি.স.) :উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের মামলায় অভিযুক্ত প্রহ্লাদ দাসের পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর ঘটনা ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের এনকাউন্টার সংক্রান্ত বয়ান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন প্রহ্লাদের মা রেখা দাস। পরিবারের দাবি, অপরাধ করে থাকলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হওয়া উচিত ছিল তাঁর ছেলের। কিন্তু পুলিশের গুলিতে তার মৃত্যু তাঁরা মেনে নিতে পারছেন না। একই সঙ্গে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও ক্ষতিপূরণের দাবিও তুলেছেন তাঁরা।
বুধবার প্রহ্লাদের মা রেখা দাস পুলিশের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ছেলেকে যখন বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছিল, তখন তার হাত বাঁধা ছিল এবং সঙ্গে পাঁচ জন পুলিশকর্মী ছিলেন। এই অবস্থায় সে কীভাবে পুলিশের পিস্তল ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালাল, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে পরিবারের। তাঁর কথায়, “মেয়েটিকেও হত্যা করা হয়েছে, আমার ছেলেকেও হত্যা করা হয়েছে। আমরা ক্ষতিপূরণ চাই।”
পরিবারের বক্তব্য, প্রহ্লাদ অপরাধ করে থাকলে আদালতে তার বিচার হোক, আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হোক—এটাই তাঁরা চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশের গুলিতে তার মৃত্যু তাঁরা মেনে নিতে পারছেন না। এলাকার মানুষের কাছে প্রহ্লাদের বিষয়ে খোঁজ নিলেই তার সম্পর্কে জানা যাবে বলেও দাবি করেছেন তাঁর মা। ছেলের শেষকৃত্যের পর থেকে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন।
প্রহ্লাদের মা মৃত কিশোরীর সঙ্গে তাঁর ছেলের সম্ভাব্য প্রেমের সম্পর্ক নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, ছেলে ফোন করার পর মেয়েটি কেন রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। তবে এই বিষয়ে পরিবারের বক্তব্যের স্বাধীন সমর্থন মেলেনি। স্থানীয়দের দাবি, প্রহ্লাদ গোবরডাঙা হিন্দু কলেজে দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। পরিবারের বক্তব্য, বিয়ের আগে নিজের বাড়ি তৈরি করার ইচ্ছা ছিল তাঁর।
মঙ্গলবার রাতে বারাসত মেডিক্যাল কলেজে ময়নাতদন্তের পর প্রহ্লাদের দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। দেহ বাড়িতে পৌঁছনোর পর মালা পরাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর বাবা রামপ্রসাদ দাস। তিনি বলেন, ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ভয়াবহ এবং এমন অপরাধের ক্ষমা নেই। তবে তাঁর বক্তব্য, অপরাধ প্রমাণিত হলে ছেলেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া যেত। পুলিশের গুলিতে এভাবে মৃত্যুর ঘটনা তাঁরা মেনে নিতে পারছেন না।
উল্লেখ্য, শনিবার গাইঘাটা থানা এলাকার ১৭ বছরের এক কিশোরী বাড়ির কাছেই একটি জলসা দেখতে গিয়েছিল। রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ একটি ফোন পেয়ে সে সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা সারা রাত খোঁজাখুঁজির পর রবিবার সকালে তার নগ্ন ও ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার করেন। পরিবারের অভিযোগ ছিল, কিশোরীকে গণধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। এই ঘটনায় রবিবারই মৃতার দূর সম্পর্কের আত্মীয় প্রহ্লাদ দাসকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
অন্যদিকে, এনকাউন্টার নিয়ে পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন। পুলিশের দাবি, মঙ্গলবার ভোরে অপরাধস্থলে ঘটনার পুনর্নির্মাণের পর প্রহ্লাদকে গাড়িতে করে থানায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। বৈদ্যবতী এলাকার কাছে সে শৌচকর্মের জন্য গাড়ি থামানোর অনুরোধ করে। এরপরই কর্তব্যরত এক পুলিশকর্মীর সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নিয়ে পরপর তিন রাউন্ড গুলি চালায় বলে অভিযোগ পুলিশের। তার মধ্যে একটি গুলি পুলিশের গাড়িতে লাগে।
পুলিশের দাবি, আকস্মিক হামলায় এক পুলিশকর্মী আহত হন এবং অন্য এক পুলিশকর্মী প্রাণ বাঁচাতে রাস্তার পাশের পুকুরে ঝাঁপ দেন। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ চার রাউন্ড গুলি চালায়। তার মধ্যে একটি গুলি প্রহ্লাদের গায়ে লাগে। পরে তাকে চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। আহত পুলিশকর্মীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
প্রহ্লাদের পরিবারের বক্তব্য এবং পুলিশের বয়ানে এই পরস্পরবিরোধী দাবি ঘিরে গাইঘাটার ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একদিকে নাবালিকার ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগের বিচার, অন্যদিকে অভিযুক্তের পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর পরিস্থিতি—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সন্তোষ মধুপ