
মেদিনীপুর, ৩ অক্টোবর (হি.স.) :
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পাঁশকুড়া ব্লকের মাইশোরা পঞ্চায়েতের অন্তর্গত মঙ্গলাই গ্রামে মৌচক সেবাশ্রমের দুর্গাপূজা এ বছর সামাজিক সম্প্রীতি এবং মিশরের প্রাচীন সভ্যতার অনন্য সংমিশ্রণে উদযাপিত হতে চলেছে। পূজার ২০তম বর্ষে তাঁদের মূল ভাবনা বা থিম হলো— ‘চাপ’। হিন্দু, মুসলিম এবং উপজাতি সম্প্রদায়ের যৌথ অংশগ্রহণে আয়োজিত এই পূজায় মণ্ডপ থেকে শুরু করে দুর্গা প্রতিমা— সর্বত্রই মিশরীয় সভ্যতার বিশেষ শৈল্পিক ছোঁয়া লক্ষ্য করা যাবে।
স্থানীয় শ্যামসুন্দরপুর পাটনা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মৃণাল সুন্দর পাত্র ২০০২ সালে দুস্থ ও অভাবী শিক্ষার্থীদের সহযোগিতার উদ্দেশ্যে তাঁর পৈতৃক জমিতে মৌচক সেবাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেখানে শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে একদিন করে হস্তশিল্পের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। শিশুরা কাদামাটি দিয়ে নানা ধরনের পুতুল ও মূর্তি তৈরি করত। ২০০৬ সালে সেবাশ্রমের তিন শিক্ষার্থী বিন্দু সিং, করিম আলী এবং যাদব জানা একসঙ্গে নিজেদের হাতে প্রথম দুর্গার প্রতিমা গড়েন। আর এর মাধ্যমেই মৌচক সেবাশ্রমে দুর্গাপূজার সূচনা হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সাল থেকে এখানে বড় পরিসরে সার্বজনীন দুর্গাপূজার আয়োজন শুরু হয়।
এ বছর ‘চাপ’ থিমের মাধ্যমে প্রকৃতি ও শিশুদের ওপর বর্তমান সমাজের বিভিন্ন চাপের চিত্র অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মণ্ডপের প্রবেশদ্বারে একটি কাল্পনিক ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রকৃতির ওপর মানুষের ক্রমবর্ধমান অত্যাচার ও চাপের ফলে পৃথিবীর ক্লান্তি ও বিপন্নতার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে, পারিবারিক ও সামাজিক চাপের কারণে আজকের শিশুদের স্বাভাবিক শৈশব কীভাবে বিনষ্ট হচ্ছে, তাও মণ্ডপের অভ্যন্তরে প্রদর্শনী ও শিল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
মণ্ডপের অভ্যন্তরীণ সজ্জায় মিশরের প্রাচীন সভ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। পিরামিড, মিশরীয় শিল্পকলা, বিভিন্ন ঐতিহাসিক ভাস্কর্য এবং মমির প্রতিকৃতি দর্শনার্থীদের মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে। এমনকি দুর্গা প্রতিমাতেও মিশরীয় শিল্পরীতি এবং দেবদেবীদের ঐতিহ্যবাহী শৈলীর স্পষ্ট ছাপ দেখতে পাওয়া যাবে।
স্বল্প বাজেটে আয়োজিত মৌচক সেবাশ্রমের এই পূজা বর্তমানে সমগ্র অঞ্চলের সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য নজির হয়ে উঠেছে। পূজা কমিটির সদস্য করিম আলী, বিন্দু সিং এবং সম্পাদক দেবব্রত কবির মতে, পূজার দিনগুলিতে সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষ জাতি-ধর্ম ও বর্ণভেদের ঊর্ধ্বে উঠে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেন এবং একসঙ্গে প্রসাদ গ্রহণ ও উদযাপনে মেতে ওঠেন।
কমিটির সদস্য করিম আলী স্মৃতিচারণ করে বলেন, প্রায় দুই দশক আগে কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে স্রেফ শখের বসে দুর্গা প্রতিমা তৈরি শুরু করেছিলেন। সে সময় কল্পনাও করা যায়নি যে, ভবিষ্যতে এই প্রয়াস এত বড় এক গণউৎসবের রূপ নেবে। অন্যদিকে বিন্দু সিং জানান, মৌচক সেবাশ্রমের পূজা সামাজিক সম্প্রীতির এক জ্বলন্ত উদাহরণ এবং উৎসবের দিনগুলিতে এটি সর্বধর্মের মানুষের মহামিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়।
সেবাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা মৃণালসুন্দর পাত্র জানান, প্রতি বছরই অত্যন্ত সীমিত বাজেটের মধ্যে নতুন নতুন মৌলিক ভাবনা নিয়ে এই পূজার আয়োজন করা হয়। এ বছর মিশরীয় সভ্যতার রূপকের মাধ্যমে এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হয়েছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সন্তোষ মধুপ