
তেলিয়ামুড়া (ত্রিপুরা), ৬ অক্টোবর (হি.স.) : পাহাড়ি জঙ্গল ও গ্রামীণ জনপদ পেরিয়ে ফের লোকালয়মুখী বুনো হাতি। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ আঠারোমুড়া পাহাড় সংলগ্ন জঙ্গল ও গ্রামীণ এলাকা ছেড়ে একটি বুনো হাতি ঢুকে পড়ে ডিএম কলোনি, মহারানিপুর ও নেতাজিনগর এলাকায়। আচমকা জনবসতির মধ্যে হাতির উপস্থিতিতে বিস্তীর্ণ এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বহু বাসিন্দা ঘরবাড়ি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সন্ধ্যার পর হাতিটিকে লোকালয় থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। হাতির গতিবিধি দেখতে এবং সেটিকে অন্যদিকে সরিয়ে দিতে এলাকাবাসীর একাংশ ফটকা ফাটানো এবং বিভিন্ন ধরনের শব্দ করতে থাকেন। কিন্তু এতে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। আতঙ্কিত হাতিটিও এদিক-ওদিক ছুটতে শুরু করে। একসময় সেটি নেতাজিনগরের লোকনাথ আশ্রম সংলগ্ন এলাকায় চলে আসে।
এরপর হাতিটির গতিবিধির উপর নজর রেখে সেটিকে লোকালয় থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের তৎপরতার মধ্যেই হাতিটি খোয়াই নদী পার হয়ে তুইকর্মা এলাকার দিকে চলে যায়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত হাতিটির অবস্থান ওই এলাকাতেই বলে জানা গিয়েছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতিটির গতিবিধি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগও অব্যাহত থাকে।
তবে মঙ্গলবারের এই ঘটনা নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে দীর্ঘদিনের মানুষ-হাতি সংঘাতের বিষয়টি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত কয়েক দশকে আঠারোমুড়া পাহাড়ের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে গাছপালা ধ্বংস এবং বনজ সম্পদের ক্রমাগত ক্ষয়ের ফলে বুনো হাতিদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। একই সঙ্গে কমেছে তাদের প্রাকৃতিক খাদ্যের জোগান। ফলে খাবারের সন্ধানে হাতির দল পাহাড়ি জঙ্গল ছেড়ে বারবার গ্রামীণ জনপদ ও লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।
হাতি লোকালয়ে প্রবেশ করলেই তৈরি হচ্ছে আতঙ্ক। শুধু মানুষের নিরাপত্তাই নয়, ক্ষতির মুখে পড়ছেন এলাকার কৃষকরাও। স্থানীয়দের দাবি, হাতির দল মাঠে ঢুকে ফসল নষ্ট করার পাশাপাশি অনেক সময় বাড়িঘরেও প্রবেশ করে খাদ্যশস্য তছনছ করে দেয়। কৃষকের ঘরে মজুত ধান খেয়ে ফেলা বা নষ্ট করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও গাছপালা ভাঙচুর, কোথাও বাড়িঘরের ক্ষতি—হাতির গতিবিধি নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশ এবং সংলগ্ন গ্রামীণ এলাকার মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে।
স্থানীয়দের বক্তব্য, অতীতেও হাতির আক্রমণে একাধিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ফলে রাতের অন্ধকারে লোকালয়ের মধ্যে বুনো হাতির প্রবেশের খবর ছড়িয়ে পড়লেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বাসিন্দারা। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও কৃষকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেশি।
মানুষ-হাতি সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের দাবিতে এর আগেও একাধিকবার প্রতিবাদে সরব হয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা। সমস্যার সমাধানের দাবিতে অসম-আগরতলা জাতীয় সড়ক অবরোধ করার মতো কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। কিন্তু প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও অবরোধের পরও পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।
পরিবেশবিদ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মতে, শুধু লোকালয়ে হাতি ঢোকার পর তাড়িয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। হাতির প্রাকৃতিক বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ, বনাঞ্চলের পুনরুদ্ধার, প্রাকৃতিক খাদ্যের জোগান বৃদ্ধি এবং হাতির চলাচলের করিডর সুরক্ষিত রাখার মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ প্রয়োজন। পাশাপাশি লোকালয় সংলগ্ন এলাকায় নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত সতর্কবার্তা এবং বন দফতর, প্রশাসন ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ