
হাফলং (অসম), ১ নভেম্বর (হি স): অসমের বাঙালি সমাজের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা নিরসন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি, ভূমির অধিকার ও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতা দূর করার দাবিতে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার দ্বারস্থ হল বাঙালি পরিষদ, অসম। সংগঠনের রাজ্য সমিতির পক্ষ থেকে উত্থাপিত হয়েছে ছয় দফা দাবি। রবিবার হোজাইয়ে বাঙালি পরিষদ, অসমের উদ্যোগে আয়োজিত এক সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে রাজ্যের মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পালের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে স্মারকলিপিটি পাঠানো হয়।
স্মারকলিপিতে বাঙালি সমাজের সাংস্কৃতিক মর্যাদা, নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি শ্রীভূমিতে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষের নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
পরিষদের ছয় দফা দাবির মধ্যে প্রথমেই রয়েছে কাছাড়ের ঐতিহ্যবাহী ধামাইল নৃত্যের সরকারি স্বীকৃতি। এই লোকসংস্কৃতিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিত করে তুলতে অসম সরকারের বিশেষ উদ্যোগ এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আবেদন জানানো হয়েছে।
দ্বিতীয় দাবিতে অসমের ভারতীয় নাগরিক বাঙালি হিন্দুদের 'বাংলাদেশি' বলে আখ্যায়িত করা কিংবা এ ধরনের অপমানজনক মন্তব্য ও প্রচার বন্ধের দাবি উঠেছে। আইনি প্রক্রিয়ায় বিদেশি নাগরিক হিসেবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনও ব্যক্তিকে বিদেশি বলে চিহ্নিত করে সামাজিকভাবে হেয় করার প্রবণতা রুখতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়েছে সংগঠনটি।
তৃতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে ডি-ভোটার সমস্যায় জর্জরিত বাঙালি হিন্দু নাগরিকদের দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আবেদন জানিয়েছে পরিষদ।
চতুর্থ দাবিতে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করেও ভূমিহীন অবস্থায় থাকা বাঙালি হিন্দু পরিবারগুলিকে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে সরকারি জমি বরাদ্দের আবেদন জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মিশন বসুন্ধরা প্রকল্পের নিয়মাবলি সরলীকরণ করে যোগ্য ভূমিহীন পরিবারগুলিকে জমি প্রদানের ব্যবস্থা করার দাবি তোলা হয়েছে।
পঞ্চম দাবিতে কার্বি আংলং জেলায় বসবাসকারী বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও হাওরাঘাট, বোকাজান-সহ বিভিন্ন এলাকায় বাঙালিরা নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের ভূমির অধিকার সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সুযোগ বৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্ট পরিষদগুলির সঙ্গে আলোচনা করে স্থায়ী সমাধানের দাবি জানানো হয়েছে।
ষষ্ঠ দাবিতে শ্রীভূমিতে দুর্গাপুজোর দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনার উচ্চপর্যায়ের বিচারবিভাগীয় তদন্ত চেয়েছে সংগঠনটি। ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন, নিরপেক্ষভাবে দোষীদের চিহ্নিতকরণ এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করার আবেদন জানানো হয়েছে।
স্মারকলিপিতে মুখ্যমন্ত্রীকে দাবিগুলির গুরুত্ব বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছে পরিষদ। সংগঠনের বক্তব্য, রাজ্যের বাঙালি সমাজের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলির স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি তাদের সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক অধিকার সুনিশ্চিত করাও জরুরি।
স্মারকলিপিতে বাঙালি পরিষদ, অসমের রাজ্য সমিতির সভাপতি ডা. শান্তনু কুমার স্যান্যাল এবং সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ কুমার নাগ-সহ অন্যান্য পদাধিকারীর স্বাক্ষর রয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্মারকলিপির প্রতিলিপি সংশ্লিষ্ট সাংসদ ও বিধায়কদের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
হোজাইয়ে আয়োজিত ওই সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য ও সুস্মিতা দেব এবং বিধায়ক কিশোর নাথ ও শিলাদিত্য দেব। তাঁদের উপস্থিতিতে মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পালের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ছয় দফা দাবিসংবলিত স্মারকলিপি পাঠানো হয়।
হিন্দুস্থান সমাচার / বিশাখা দেব