
কলকাতা, ১২ মার্চ (হি.স.): পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে টান পড়েছে। তার সরাসরি প্রভাব এবার পড়তে শুরু করেছে পশ্চিমবঙ্গের জনজীবনে। রান্নার গ্যাসের আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি এবং জোগান হ্রাসের ফলে রাজ্যের মন্দির, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের হেঁসেল— সর্বত্রই তৈরি হয়েছে চরম অরাজকতা। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে, তেমনই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী মন্দিরগুলিতেও। বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা মন্দিরে শুক্রবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ভক্তদের ভোগ রান্না বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাস্টি বোর্ড। বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা না থাকায় এই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়েছে বলে মন্দির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন। একই চিত্র তমলুকের বর্গভীমা মন্দিরেও, যেখানে আগামী ২১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ভোগ বিতরণ বন্ধ রাখা হবে। দিঘার জগন্নাথ মন্দিরেও গ্যাসের আকাল মেটা পর্যন্ত প্রতিদিন ৩ হাজার ভক্তের পরিবর্তে মাত্র ৭০০ জনের ভোগ রান্নার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, প্রয়োজনীয় গ্যাস সিলিন্ডার না মেলায় সোমবার থেকে সর্বসাধারণের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ থাকছে নৈহাটির বড়মার মন্দিরে ভোগ বিতরণ।
গ্যাসের অভাব সরাসরি আঘাত হেনেছে শিক্ষা ক্ষেত্রেও। উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমার সীমান্তবর্তী এলাকার স্কুলগুলিতে গ্যাসের পরিবর্তে কাঠ জ্বালিয়ে মিড-ডে মিলের রান্না করতে বাধ্য হচ্ছেন কর্মীরা। সাইপালা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো বড় স্কুলগুলিতে এই পদ্ধতিতে রান্না করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেব্রা হাসপাতালের ক্যান্টিনে শুক্রবার থেকেই গ্যাসের সংকট দেখা দেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতির মোকাবিলায় আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
পর্যটন মরশুমে শিলিগুড়ির হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ক্যাটারিং ব্যবসায়ীরা মাথায় হাত দিয়েছেন। পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় পর্যটকদের পরিষেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা। ঝাড়গ্রাম শহরে গ্যাস বুকিং করতে না পেরে সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা এজেন্সির সামনে লম্বা লাইন দিচ্ছেন। বহু রেস্তোরাঁ ইতিমধ্যেই সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে জানিয়েছে যে, গ্যাসের অভাবে পরিষেবা বন্ধ রাখতে তারা বাধ্য হচ্ছে।
গ্যাস সংকট নিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে সংঘাত তীব্র হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পরিস্থিতির জন্য কেন্দ্র সরকারের ‘ভুল বিদেশ নীতি’ ও ‘বিকল্প পরিকল্পনাহীনতাকে’ দায়ী করেছেন। আগামী সোমবার (১৬ মার্চ) কলেজ স্কোয়ার থেকে ডোরিনা ক্রসিং পর্যন্ত প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী ডঃ সুকান্ত মজুমদার এই অভিযোগকে নস্যাৎ করে দিয়ে দাবি করেছেন যে, তৃণমূল কংগ্রেস পরিকল্পিতভাবে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, অনেক তৃণমূল নেতাই গ্যাস ডিলার এবং তাঁরাই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কালোবাজারিতে লিপ্ত হচ্ছেন।
প্রশাসনের সক্রিয়তা ও এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের অভিযান
কালোবাজারি রুখতে ময়দানে নেমেছে পুলিশ ও জেলা এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ। বর্ধমান জেলার ২০টি জায়গায় এবং উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় পুলিশ ও এনফোর্সমেন্ট আধিকারিকরা বিভিন্ন গ্যাস গোডাউন ও ডিলারদের অফিসে হানা দিয়েছেন। মজুত সিলিন্ডারের হিসাব পরীক্ষা করার পাশাপাশি ডমেস্টিক সিলিন্ডার বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, কলকাতায় রান্নার গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে হাতিবাগান মোড়ে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখিয়েছে কংগ্রেস। প্রদেশ কংগ্রেসের পক্ষ থেকে পরে মৌলালি পর্যন্ত একটি প্রতিবাদ মিছিলও বের করা হয়।
সব মিলিয়ে, বর্তমান গ্যাস সংকট পশ্চিমবঙ্গের ঘরে ঘরে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সংকট থেকে মুক্তির কোনও সহজ পথ দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি