
কলকাতা ও দিঘা, ৩০ মার্চ (হি. স.) : বসন্তের শেষবেলায় টলিউড হারাল তার অন্যতম প্রতিভাধর শিল্পী রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে। গত ২৯ মার্চ ওড়িশার তালসারিতে শুটিং চলাকালীন সমুদ্রে তলিয়ে গিয়ে মৃত্যু হয় তাঁর। সোমবার ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ কলকাতায় পৌঁছতেই শোকের ছায়া নেমে আসে তাঁর বিজয়গড়ের বাসভবনে। প্রিয় অভিনেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এদিন সাধারণ মানুষের ঢল নামে রাজপথে। সোমবার বিকেলে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে আড়ম্বরহীনভাবেই সম্পন্ন হয় অভিনেতার শেষকৃত্য।
সোমবার সকালে প্রথমে কাঁথি এবং পরে প্রশাসনিক জটিলতায় তমলুক হাসপাতালে রাহুলের দেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা রীতিমতো শিহরণ জাগানোর মতো। চিকিৎসকদের মতে, এটি ‘অ্যাসফিসিয়া’ বা শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা। দীর্ঘক্ষণ জলের তলায় থাকার ফলে অভিনেতার ফুসফুস স্বাভাবিকের তুলনায় ফুলে দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। তাঁর ফুসফুস, শ্বাসনালি, এমনকি পাকস্থলির ভেতর থেকেও প্রচুর পরিমাণে বালি এবং নোনা জল উদ্ধার হয়েছে। চিকিৎসকদের অনুমান, অভিনেতা অন্তত এক ঘণ্টা বা তার বেশি সময় জলের তলায় নিখোঁজ ছিলেন। নোনা জল ফুসফুসে ঢুকে যাওয়ায় যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু হয়েছে তাঁর।
জানা গেছে, রবিবার ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ নামক একটি ধারাবাহিকের আউটডোর শুটিং চলছিল তালসারিতে। সমুদ্রের পাড়ে একটি দৃশ্যের শুটিং করার সময় হঠাৎই দুর্ঘটনাটি ঘটে। তদন্তে নেমে পুলিশ ইতিমধ্যেই শুটিংয়ে ব্যবহৃত ক্যামেরা এবং ড্রোন ফুটেজ বাজেয়াপ্ত করেছে।
পরিচালক শুভাশিস মণ্ডলের বয়ান অনুযায়ী, দৃশ্যটি ছিল হাঁটু সমান জলে রাহুল এবং অভিনেত্রী শ্বেতা মিশ্রের হাত ধরে হাঁটার। কিন্তু উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের টানে তাঁরা অনেকটা গভীরে চলে যান। ইউনিটের সদস্যরা বারবার বারণ করা সত্ত্বেও বাতাসের শব্দে তাঁরা তা শুনতে পাননি। ফুটেজে দেখা গিয়েছে, শ্বেতা আচমকা ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেলে তাঁকে বাঁচাতে যান রাহুল। ঠিক তখনই একটি বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ে দু’জনকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ইউনিটের সদস্যরা শ্বেতাকে উদ্ধার করতে পারলেও রাহুলকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে স্পিড বোটের সাহায্যে তাঁকে নিথর অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, এটি একটি নিছক দুর্ঘটনা, তবে নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সোমবার দুপুরে ময়নাতদন্তের পর রাহুলের মরদেহ নিয়ে একটি শববাহী গাড়ি কলকাতার বিজয়গড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। বিকেলে দেহ বিজয়গড়ে পৌঁছতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর পরিবার ও প্রতিবেশীরা। ছেলের অকাল প্রয়াণে বারবার সংজ্ঞা হারাচ্ছেন রাহুলের বৃদ্ধা মা। বিচ্ছেদের যন্ত্রণা সরিয়ে রেখে এই কঠিন সময়ে শাশুড়ি ও ছেলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন রাহুলের স্ত্রী তথা অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার।
বিজয়গড়ের বাড়িতে রাহুলকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পৌঁছেছিলেন টলিউডের মহাতারকা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়, ইশা সাহা, ঋদ্ধিমা ঘোষ, অঙ্কুশ হাজরা, ঐন্দ্রিলা সেন সহ আরও অনেক সহকর্মী। উপস্থিত ছিলেন ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস। রাজনীতির ময়দানে রাহুল বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন, তাই এদিন তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে পৌঁছেছিলেন সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমও।
নির্বাচনী প্রচারে উত্তরবঙ্গে ব্যস্ত থাকায় শেষযাত্রায় থাকতে পারেননি অভিনেতা তথা সাংসদ দেব। তবে সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক বার্তায় দেব বলেন, “বড্ড তাড়াতাড়ি চলে গেল। রাহুলের প্রথম ছবি ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’-এর সেই বিখ্যাত গানে আমি নেচেছিলাম। ওর সঙ্গে শপিং করতে যাওয়া বা আড্ডা দেওয়ার মুহূর্তগুলো চোখের সামনে ভাসছে। শিল্পী হিসেবে ওকে আমি খুব শ্রদ্ধা করতাম।” স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ইশা সাহা বা রুকমা রায়ের মতো সহকর্মীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
বিজয়গড় থেকে রাহুলের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেওড়াতলা মহাশ্মশানে। তবে সেখানে প্রবেশ নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। রাহুলের স্কুলের বন্ধুদের অভিযোগ, শ্মশানের গেটে পুলিশ কেবল ‘সেলেব্রিটি’দের প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছিল, আর সাধারণ বন্ধু ও পরিচিতদের আটকে দেওয়া হচ্ছিল। এই নিয়ে শ্মশান চত্বরে পুলিশের সঙ্গে তীব্র বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন তাঁর বাল্যবন্ধুরা। তাঁদের দাবি, “আমরা শৈশব থেকে ওকে দেখছি, আমাদের শেষ বিদায় জানানোর অধিকার আছে।” শেষমেশ উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই রুকমা রায় ও অন্য বন্ধুদের উপস্থিতিতে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই চিরতরে পঞ্চভূতে বিলীন হলেন রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাহুলের এই অকাল মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সুর চড়িয়েছে ‘অল ইন্ডিয়ান সিনে ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন’। সংগঠনের দাবি, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং কাঠামোগত ব্যর্থতা। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ এবং প্রযোজনা সংস্থা খরচ কমানোর জন্য প্রায়ই শিল্পীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে আপস করে। এই গাফিলতির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চেয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছে সংগঠনটি। দোষী প্রযোজনা সংস্থাকে কালো তালিকাভুক্ত করার দাবিও তোলা হয়েছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি