
নালন্দা, ৩১ মার্চ (হি.স.): বিহারের নালন্দা জেলার মাঘরা গ্রামের মা শীতলা মন্দিরে পদপিষ্টের মর্মান্তিক ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯-এ পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৭ জন। মঙ্গলবার সকালে পুজো দিতে আসা বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থীর ভিড়, তীব্র গরম এবং পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনার অভাব মিলেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। ঘটনায় রাজ্যজুড়ে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশ সুপার ভারত সোনি জানিয়েছেন, প্রতি মঙ্গলবারের মতো এদিনও বহু পুণ্যার্থী মন্দিরে ভিড় করেন, তবে এদিন ভিড় স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। গরমের মধ্যে ঠান্ডা জলে স্নানের পর মন্দিরে প্রবেশের সময় ভিড়ের চাপে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। শ্বাসকষ্ট, জলের অভাব এবং ধাক্কাধাক্কির জেরে কয়েকজন অজ্ঞান হয়ে পড়লে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এরপরই হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে পদপিষ্টের ঘটনা ঘটে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকাজ শুরু করা হয়। আহতদের দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং গুরুতরদের উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে আহতদের অধিকাংশের অবস্থাই স্থিতিশীল বলে জানা গেছে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্তের জন্য বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি ফরেনসিক দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে নমুনা সংগ্রহ করেছে এবং সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার পর প্রশাসনিক স্তরে কড়া পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। দীপনগর থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক(স্টেশন হাউস অফিসার) রাজমণিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, কোনও রকম গাফিলতি প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিহতদের তালিকায় রয়েছেন রিতা দেবী (বিহার শরিফ), রেখা দেবী (নুরসরাই), অনুষ্কা (দেবী রাহুই), কান্তি দেবী (নওয়াড়া), দেবন্তী দেবী (ইসলামপুর), মালো দেবী (হিলসা), চিন্তা দেবী (রাহুই), কান্তি দেবী (দীপনগর) এবং গুড়িয়া দেবী (সালুগঞ্জ মহল্লা)।
এই ঘটনায় কেন্দ্র ও রাজ্য—দুই স্তর থেকেই ক্ষতিপূরণের ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শোকপ্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে মৃতদের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তার কথা জানিয়েছেন। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারও গভীর শোক প্রকাশ করে মৃতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছেন—যার মধ্যে ৪ লক্ষ টাকা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দফতর থেকে এবং ২ লক্ষ টাকা মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে দেওয়া হবে।
উপমুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী সহ একাধিক রাজনৈতিক নেতা এই ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন। অন্যদিকে বিরোধী শিবির প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, আগে থেকেই বিপুল ভিড়ের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন বা ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মন্দির চত্বরে নিরাপত্তা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল ছিল। এমনকি জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স বা চিকিৎসা ব্যবস্থাও সময়মতো পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ঘটনাস্থলের কাছাকাছি এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সফর উপলক্ষে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন থাকলেও মন্দির এলাকায় সেই তুলনায় পর্যাপ্ত নজরদারি ছিল না—এমন অভিযোগও উঠেছে স্থানীয়দের তরফে।
এই মর্মান্তিক ঘটনা ফের বড় ধর্মীয় জমায়েতে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিষেবার প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রশাসন জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আপাতত আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উপরই জোর দেওয়া হচ্ছে।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য