
নয়াদিল্লি, ৫ মাৰ্চ (হি.স.) : নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক ‘কনস্টিটিউশন ক্লাব অব ইন্ডিয়া’-য় আয়োজিত উত্তর-পূর্ব সম্মেলন ২০২৬ আজ বৃহস্পতিবার সমাপ্ত হয়েছে। দিল্লি-ভিত্তিক ‘নর্থ-ইস্ট অর্গানাইজেশন’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, নীতি-বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী এবং সংস্কৃতি সাধকেরা একত্রিত হয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
সম্মেলনের কয়েকটি অধিবেশনে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ব্যবস্থা, উন্নয়নের পথ, নীতি-দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক সমন্বয় এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদ্ভূত পরিবর্তনশীল উন্নয়ন প্রক্রিয়ার ওপরও আলোকপাত করা হয়েছে সম্মেলনে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অসমের বিশিষ্ট প্রশাসক, ভারতের পর্যটন মন্ত্রকের প্রাক্তন সচিব ও অবসরপ্রাপ্ত আইএএস আধিকারিক মদনপ্রসাদ বেজবরুয়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংবেদনশীলতা এবং দেশের অন্যান্য অংশের সঙ্গে এর ক্রমবর্ধমান সংযোগের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বক্তব্য পেশ করেছেন। ভারতের অতিরিক্ত সলিসিটার জেনারেল অ্যাডভোকেট বিক্রম বন্দ্যোপাধ্যায় অঞ্চলের স্বতন্ত্র ঐতিহ্যবাহী আইনগুলোর বৈশিষ্ট্য এবং সেগুলো কীভাবে আদিবাসী পরিচয় সংরক্ষণ ও সামাজিক সাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে তা ব্যাখ্যা করেন।
এছাড়া রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সর্বভারতীয় সহ-প্রচারপ্রধান নরেন্দ্র ঠাকুর উত্তর-পূর্ব ভারতের গৌরবময় সভ্যতাগত ইতিহাসের কথা উল্লেখ করে মহাভারতের যুগ থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত এর সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা নিয়ে আলোচনা করেন।
নাগাল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং সাংবাদিক-গবেষক সমুদ্রগুপ্ত কাশ্যপ উত্তর-পূর্ব ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উল্লেখযোগ্য অবদান স্মরণ করে ভারতের জাতীয় আন্দোলনে তাঁদের ত্যাগের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন।
অন্যদিকে, অধিবেশনে মেঘালয়ের ন্যাশনাল কমিশন ফর উইমেন-এর সদস্য দেলিনা খংদুপ মেঘালয়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে আলোচনা করে অঞ্চলের সাংস্কৃতিক জগতকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
মণিপুরের সমাজকর্মী প্রেমানন্দ শর্মা ভারতের ক্রীড়া জগতে উত্তর-পূর্ব ভারতের অসাধারণ অবদান এবং এখানকার খেলোয়াড়দের বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতির ওপর আলোকপাত করেন।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এইনাম ভগত বলেন, ঔপনিবেশিক যুগের ইতিহাসচর্চা অনেক সময় উত্তর-পূর্ব ভারতের ইতিহাসকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। তাই সঠিক গবেষণার প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি জোর দিয়েছেন।
নৰ্থ-ইস্ট সেন্টার ফর টেকনোলজি অ্যাপ্লিক্যাশন অ্যান্ড রিসার্চ-এর মহাপরিচালক অরুণ শর্মা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাম্প্রতিক উন্নয়নযাত্রা নিয়ে আলোচনা করে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, উন্নয়নমূলক নীতি এবং নতুন সুযোগের কথা তুলে ধরেন।
সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট সাংবাদিক, ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য আর্টস-এর চেয়ারম্যান, পদ্মভূষণপ্রাপ্ত রামবাহাদুর রাই উত্তর-পূর্ব ভারতের ইতিহাস ও সমকালীন বাস্তবতাকে প্রভাবিত করে এমন বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরে এই অঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে সারা দেশে বাড়তে থাকা আগ্রহের কথা উল্লেখ করেন।
মণিপুর ইউনিভার্সিটি অব সেন্টার-এর উপাচার্য ড. পুনম গুণীন্দ্র বলেন, সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দেশ ও বিশ্বের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে।
সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য পেশ করেছেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রচারপ্রমুখ ড. সুনীল মহান্তি। তিনি সামাজিক সমন্বয় শক্তিশালী করার গুরুত্ব তুলে ধরে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে এর ভূমিকার কথা ব্যাখ্যা করেন এবং ‘ঈশান্য ভারত’-এর কৌশলগত ও সভ্যতাগত গুরুত্বের ওপর আলোকপাত করেন।
সম্মেলনের অংশ হিসেবে আয়োজিত বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য সম্মান জানানো হয়েছে। ‘নৰ্থ-ইস্ট ইন্ডিয়া অ্যাচিভাৰ্স ২০২৬’-এর পুরস্কারপ্রাপকরা যথাক্রমে অরুণাচল প্রদেশের তানা ইয়ামী (টেকসই কৃষি ও গ্রামীণ জীবিকার উন্নয়নে অবদানের জন্য), অসমের অনন্যা তালুকদার (গুয়াহাটিতে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে সত্রীয়া নৃত্য প্রচার ও শিক্ষাদানের জন্য), মণিপুরের লেইমাপোকপাম লখপতি সিং (অভিনয় ও পারফর্মিং আর্টসে অবদানের জন্য), মিজোরামের লল্টলন ঝাউভাকে মিজো (জো হ্নম সাখুয়া) আদিবাসী সংস্কৃতি সংরক্ষণে কাজের জন্য, নাগাল্যান্ডের ইয়োসে সায়া আঙ্গামি (আঙ্গামি নাগা ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য), ত্রিপুরার ধম্মপিয়া (শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নে অবদানের জন্য)।
সম্মেলনের শেষে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্য শক্তিশালী করা, সাংস্কৃতিক গৌরব বৃদ্ধি করা, নীতি-সংলাপ এগিয়ে নেওয়া এবং উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের একটি যৌথ অঙ্গীকারপ্ৰত্ৰ প্রকাশ করা হয়। আলোচনায় পুনরায় নিশ্চিত করা হয় যে, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভারতের সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য, কৌশলগত গুরুত্ব এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে ক্রমশ উঠে আসছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস