(লিড-১) বাংলার ভোটযুদ্ধ ২০২৬ : অন্তিম দফায় ৯১ শতাংশের রেকর্ড ভোটদান, হিংসা ও রাজনৈতিক সংঘাতের আবহে সম্পন্ন শেষ দফার নির্বাচন
কলকাতা, ২৯ এপ্রিল ( হি. স.) : কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে বিক্ষিপ্ত অশান্তি ও উত্তেজনার মধ্যেই সম্পন্ন হলো ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় তথা অন্তিম দফার ভোটগ্রহণ। বুধবার কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের সাতটি জেলার মোট
নির্বাচন


কলকাতা, ২৯ এপ্রিল ( হি. স.) : কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে বিক্ষিপ্ত অশান্তি ও উত্তেজনার মধ্যেই সম্পন্ন হলো ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় তথা অন্তিম দফার ভোটগ্রহণ।

বুধবার কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের সাতটি জেলার মোট ১৪২টি আসনে ভোট দিয়েছেন সাধারণ মানুষ। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এদিন রাজ্যে রেকর্ড সংখ্যক ভোট পড়েছে। রাত পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী ভোটদানের গড় হার প্রায় ৯১.৪১ শতাংশ। এই বিপুল পরিমাণ ভোটদান রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। আগামী ৪ মে নির্ধারিত হবে রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতা কার হাতে থাকবে।

এদিন সকাল সাতটা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর থেকেই বুথে বুথে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটদানের হারও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। সকাল ন'টা পর্যন্ত ভোট পড়ার হার ছিল প্রায় ১৮ শতাংশ, যা দুপুর একটা নাগাদ দাঁড়িয়েছিল ৬১.১১ শতাংশে। জেলাওয়ারি পরিসংখ্যানে সবথেকে এগিয়ে ছিল পূর্ব বর্ধমান জেলা, যেখানে ভোট পড়েছে ৯৩.৩৯ শতাংশ। অন্যদিকে মহানগরের কলকাতা দক্ষিণে সবথেকে কম ৮৭.২৫ শতাংশ ভোট রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৯১.৪৫ শতাংশ, উত্তর ২৪ পরগনায় ৯১.৩৯ শতাংশ, হুগলিতে ৯১.৪১ শতাংশ, নদিয়ায় ৯১.৩৫ শতাংশ এবং হাওড়ায় ৯০.৯৩ শতাংশ ভোট পড়েছে। উত্তর কলকাতায় ভোটদানের হার ছিল ৮৮.৯১ শতাংশ।

এবারের নির্বাচনের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ভবানীপুর আসন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর এই লড়াই কার্যত রণক্ষেত্রের রূপ নেয়। এদিন শুভেন্দু অধিকারী কালীঘাটের বুথ পরিদর্শনে গেলে তৃণমূল সমর্থকরা তাঁকে ঘিরে ধরে চোর-চোর স্লোগান দিতে শুরু করেন। পাল্টা জয় শ্রীরাম ধ্বনি তোলেন বিজেপি কর্মীরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে হরিশ মুখার্জি রোডের মোড়ে পুলিশকে মৃদু লাঠিচার্জ করতে হয়। শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন যে মুখ্যমন্ত্রী চাপে পড়ে সকাল সকাল বুথে ঘুরছেন এবং তিনি ভবানীপুরে ৩০ হাজার ভোটে হারতে চলেছেন। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোট দিয়ে বেরিয়ে নির্বাচন কমিশন ও ভিনরাজ্যের পর্যবেক্ষকদের কড়া সমালোচনা করে অভিযোগ করেন যে, পর্যবেক্ষকরা বিজেপির আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করছেন।

নিরাপত্তার খাতিরে ২,৩২১ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকলেও বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্তপাত ও গোলমালের খবর পাওয়া গেছে। নদিয়ার চাপড়া বিধানসভার ৫৩ নম্বর বুথে যাওয়ার পথে বিজেপি এজেন্ট মুশারফ মীরের ওপর হামলা চালানো হয় এবং তাঁর মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তীতে বিজেপি প্রার্থী বিকাশ সরদারের ওপর হামলা চালিয়ে তাঁর গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং তাঁর নিরাপত্তারক্ষীর আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। ভাঙড়ে আইএসএফ নেতা নওশাদ সিদ্দিকী বুথে পৌঁছালে তাঁকে ঘিরে তৃণমূল কর্মীদের স্লোগান ও ধাক্কাধাক্কির জেরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এখানেও পুলিশকে লাঠিচার্জ করতে হয়েছে। ডায়মন্ড হারবারের ফলতায় ইভিএমের ওপর সেলোটেপ লাগিয়ে বিজেপি ও বামেদের বোতাম ঢেকে দেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়মের ছবি সামনে এসেছে।

মানবিক ও নজিরবিহীন কিছু ঘটনাও এই দফায় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্দেশখালির ১৭৬ নম্বর বুথে ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা আল্পনা পাত্র ভোট দিতে গিয়ে জানতে পারেন যে ভোটার তালিকায় তাঁকে মৃত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি প্রশাসনের কাছে এর জবাব চান। এছাড়া এন্টালিতে বিজেপি প্রার্থী প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়াল তাঁর এজেন্টকে বুথে ঢুকতে বাধা দেওয়ার অভিযোগে প্রিসাইডিং অফিসারের সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন। হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে ভোট দিতে এসে এক ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে এবং পরিবারের অভিযোগ কেন্দ্রীয় বাহিনীর ধাক্কায় পড়ে গিয়েই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।

এদিন মোট ১৪৪৮ জন প্রার্থীর ভাগ্য ইভিএম বন্দি হলো। ভবানীপুর ছাড়াও কলকাতা বন্দরে ফিরহাদ হাকিম, রাসবিহারীতে স্বপন দাশগুপ্ত ও দেবাশিস কুমার, চৌরঙ্গীতে নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বালিগঞ্জে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েটদের লড়াই আজ শেষ হলো। বারাসাত, হাবড়া এবং নদিয়ার কল্যাণী ও শান্তিপুরে একাধিক বুথে ইভিএম বিকল হওয়ার কারণে ভোটগ্রহণ সাময়িকভাবে ব্যাহত হলেও মোটের ওপর ভোটপ্রক্রিয়া চলেছে দীর্ঘ সময় ধরে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম দফার ৯৩ শতাংশের পর দ্বিতীয় দফাতেও ৯১ শতাংশের বেশি ভোটদান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রাজ্যের ভোটাররা অত্যন্ত সচেতনভাবে তাঁদের রায় দিয়েছেন। এখন সব পক্ষের নজর আগামী ৪ মে’র ফলাফলের দিকে।

হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি




 

 rajesh pande