
কলকাতা, ২৯ মে (হি.স.): পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় তথা শেষ দফায় ১৪২টি আসনে বুধবার ভোটগ্রহণ চলাকালীন কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন জায়গা থেকে হিংসা ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। কলকাতা থেকে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা—সর্বত্রই রাজনৈতিক উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে।
ভোট শুরু হওয়ার আগেই নদিয়া জেলার চাপড়া বিধানসভা কেন্দ্রের ৫৩ নম্বর বুথে যাওয়ার পথে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এজেন্ট মুশারফ মীরের ওপর হামলা চালানো হয়। বিজেপির অভিযোগ, তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থকরা ওই এজেন্টকে নৃশংসভাবে মারধর করেছে এবং তাঁর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে।
কলকাতার হাই-প্রোফাইল কেন্দ্র ভবানীপুরে নিরাপত্তাবাহিনী বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই কার্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সতর্ক করে যখন তিনি ভোটকেন্দ্রের কাছে কিছু লোকজনকে নিয়ে বসেছিলেন। অন্যদিকে, এই বিধানসভা কেন্দ্রেরই কালীঘাটে শুভেন্দু অধিকারী বুথ পরিদর্শনে পৌঁছালে সেখানে উপস্থিত তৃণমূল কর্মী ও সমর্থকরা তাঁকে ঘিরে ধরে “চোর-চোর” স্লোগান দিতে শুরু করেন। এর জবাবে বিজেপি সমর্থকরা “জয় শ্রীরাম” ধ্বনি দেন। দুই পক্ষের এই স্লোগান-পাল্টা স্লোগানে কালীঘাট রোড ও হরিশ মুখার্জি রোডের মোড়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অবস্থা বেগতিক দেখে শুভেন্দু অধিকারী সেখান থেকেই নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানান এবং ফোন করে কেন্দ্রীয় বাহিনী ডাকার কথা বলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিশাল পুলিশ বাহিনী ও কেন্দ্রীয় বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে হালকা লাঠিচার্জ করতে হয়।
ভবানীপুরের প্রতিবেশী বিধানসভা কেন্দ্র রাসবিহারীতে সকাল থেকেই উত্তজনা ছিল। সেখানে কংগ্রেসের পোলিং এজেন্টকে বুথে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ভাঙড় এলাকায় সারাদিন পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। এখানে আইএসএফ নেতা নওশাদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ার ঘটনায় উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। নওশাদ পৌঁছানো মাত্রই তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীরা “জয় বাংলা” স্লোগান দিতে শুরু করেন, যার ফলে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ ও ধাক্কাধাক্কির পরিস্থিতি তৈরি হয়। অবস্থা সামাল দিতে মোতায়েন থাকা কেন্দ্রীয় বাহিনী ও রাজ্য পুলিশ ময়দানে নামে। ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশকে লাঠিচার্জ করতে হয়।
এই জেলারই বাসন্তী বিধানসভা কেন্দ্রের ৭৬ নম্বর বুথে বিজেপি প্রার্থী বিকাশ সরদারের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। বিকাশ সরদার অভিযোগ করেছেন যে, তিনি বুথ পরিদর্শনে গেলে কিছু লোক তাঁকে ঘিরে ধরে আক্রমণ করে। হামলার সময় তাঁর গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এমনকি তাঁর নিরাপত্তারক্ষীর আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টাও করা হয়েছে বলে অভিযোগ। এই ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
ক্যানিং পশ্চিমের ১১৩ নম্বর বুথে তৃণমূলের পোলিং এজেন্ট প্রদীপ দাসকে সিআরপিএফ কর্মীরা মারধর করে বুথ থেকে বের করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ। তৃণমূল প্রার্থী পরেশ রাম দাস এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
অন্যদিকে, ডায়মন্ড হারবারের ফলতা এলাকায় ইভিএমে টেপ সেঁটে দেওয়ার অভিযোগে রাজনৈতিক তিক্ততা বৃদ্ধি পায়। বিজেপি একটি ছবি শেয়ার করে অভিযোগ করেছে যে, যে বোতামগুলোতে টেপ লাগানো হয়েছিল তার মধ্যে তিন নম্বরে বিজেপি এবং চার নম্বরে সিপিআইএম-এর প্রতীক ছিল। বিজেপির দাবি, ভোটাররা যাতে তাঁদের প্রার্থীকে ভোট দিতে না পারেন তার জন্য এটি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছে। বিজেপি এর জন্য তৃণমূলকে দায়ী করে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে।
হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে ভোট দিতে এসে এক ৮০ বছর বয়স্ক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, কেন্দ্রীয় বাহিনীর এক জওয়ানের ধাক্কায় তিনি পড়ে যান এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
হাওড়ার বালি বিধানসভা কেন্দ্রের লিলুয়া এলাকায় ডন বস্কো লিলুয়া সোহনলাল স্কুলে ইভিএম বিকল হওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তজনা ছড়ায়। ভোটপ্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং তাঁরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে লাঠিচার্জ করতে হয়। এই ঘটনায় দু'জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বরাহনগর বিধানসভা কেন্দ্রের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের শিব চন্দ্র সর্বভৌম স্কুলে উত্তেজনা ছড়ায়। বিজেপি প্রার্থী সজল ঘোষ অভিযোগ করেন যে, কর্তব্যরত বিএলও সঠিক পরিচয়পত্র যাচাই না করেই অনেককে বুথে ঢুকতে দিচ্ছেন। তাঁর আশঙ্কা, এই গাফিলতির সুযোগ নিয়ে ভুয়ো ভোটার প্রবেশ করতে পারে। তিনি ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের অবজার্ভারকে অভিযোগ জানিয়েছেন।
সন্দেশখালির ১৭৬ নম্বর বুথে এক নজিরবিহীন ও হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা আল্পনা পাত্র ভোট দিতে গিয়ে জানতে পারেন ভোটার তালিকায় তাঁকে 'মৃত' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কান্নায় ভেঙে পড়ে ওই বৃদ্ধা বলেন, আমি বেঁচে থাকতেও কেন তালিকায় মৃত? খবর পেয়ে বিজেপি প্রার্থী রেখা পাত্র ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এন্টালিতে বিজেপি প্রার্থী প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়াল তাঁর এজেন্টকে বুথে ঢুকতে বাধা দেওয়ার অভিযোগে সরব হন। ছোট ঘরের অজুহাতে এজেন্টকে বের করে দেওয়া হয়েছিল বলে তাঁর দাবি। এই নিয়ে বুথের ভেতরেই আধিকারিকদের সঙ্গে তাঁর তীব্র বচসা ও ধাক্কাধাক্কি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পরে তৃণমূল ও বিজেপি—উভয় পক্ষের প্রতিনিধিকেই বুথ থেকে বের করে দেওয়া হয়।
পাশাপাশি উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাত, হাবড়া, স্বরূপনগর এবং নদিয়ার কল্যাণী ও শান্তিপুর সহ বেশ কিছু এলাকায় ইভিএমে যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে ভোট দেরিতে শুরু হয়।
নির্বাচন কমিশনের দাবি অনুযায়ী ভোট প্রক্রিয়া মোটের ওপর নিয়ন্ত্রণেই ছিল, তবে ভোটার তালিকায় ভুল, ইভিএম বিভ্রাট এবং এজেন্টদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও পশ্চিমবঙ্গের হিংসাত্মক নির্বাচনী ইতিহাসের নিরিখে এই দফার নির্বাচন কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়া মোটের ওপর শান্তিপূর্ণই বলা চলে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোনালি