চাঁদের পথে আর্টেমিস-২, অর্ধশতাব্দী পর গভীর মহাকাশে মানুষের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ
কেপ ক্যানাভেরাল, ৩ এপ্রিল (হি. স.): প্রায় অর্ধশতাব্দী পর আবারও গভীর মহাকাশে মানুষের প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী হচ্ছে বিশ্ব। -র ‘আর্টেমিস-২’ মিশন মানব মহাকাশ অভিযানের এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ পেরিয়ে চার সদস্যের নভোচারী দল এখন দ্রুত
চাঁদের পথে আর্টেমিস-২, অর্ধশতাব্দী পর গভীর মহাকাশে মানুষের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ


কেপ ক্যানাভেরাল, ৩ এপ্রিল (হি. স.): প্রায় অর্ধশতাব্দী পর আবারও গভীর মহাকাশে মানুষের প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী হচ্ছে বিশ্ব। -র ‘আর্টেমিস-২’ মিশন মানব মহাকাশ অভিযানের এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ পেরিয়ে চার সদস্যের নভোচারী দল এখন দ্রুতগতিতে চাঁদের দিকে এগিয়ে চলেছে, যা অ্যাপোলো যুগের পর প্রথম মানববাহী গভীর মহাকাশ অভিযান হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিচ্ছে।

এই ঐতিহাসিক অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কমান্ডার । তাঁর সঙ্গে রয়েছেন পাইলট , মিশন স্পেশালিস্ট এবং -র নভোচারী । ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযানে চড়ে তাঁরা চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা করছেন, যা শক্তিশালী ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ (এসএলএস) রকেটের সাহায্যে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে।

১ এপ্রিল থেকে উৎক্ষেপণের পর মিশনের প্রথম ধাপেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ট্রান্সলুনার ইনজেকশন’ সফলভাবে সম্পন্ন হয়। এর মাধ্যমে মহাকাশযানটি পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাব থেকে বেরিয়ে চাঁদের দিকে স্থায়ী গতিপথে প্রবেশ করে। এই মিশনটি চাঁদে অবতরণ নয়, বরং একটি ‘লুনার ফ্লাইবাই’। অর্থাৎ, মহাকাশযানটি চাঁদের খুব কাছ দিয়ে ঘুরে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবে।

এই যাত্রাপথে ‘ওরিয়ন’ চাঁদের দূর প্রান্ত অতিক্রম করে প্রায় ৬,৪০০ কিলোমিটার অতিরিক্ত দূরত্বে পৌঁছাবে। এর ফলে নভোচারীরা মানব ইতিহাসে সবচেয়ে দূরে ভ্রমণকারী হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়তে পারেন, যা ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো-১৩ মিশনের রেকর্ডকেও অতিক্রম করবে। পুরো যাত্রায় প্রায় ৪ লক্ষ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করা হবে এবং মোট সময় লাগবে প্রায় ১০ দিন।

মিশনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল মানুষের উপস্থিতিতে মহাকাশযানের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা পরীক্ষা করা। এর মধ্যে রয়েছে জীবনরক্ষা ব্যবস্থা (লাইফ সাপোর্ট ), ন্যাভিগেশন, যোগাযোগ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রপালশন সিস্টেম। এই তথ্যগুলো ভবিষ্যতের -এর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে ২০২৮ সালে আবারও মানুষের চাঁদের মাটিতে পদচারণার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই মিশন বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির দিক থেকেও এক নতুন বার্তা দিচ্ছে। ভিক্টর গ্লোভার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী হিসেবে চাঁদের নিকটবর্তী হচ্ছেন, ক্রিস্টিনা কচ প্রথম মহিলা হিসেবে এই দূরত্বে পৌঁছাতে চলেছেন এবং জেরেমি হ্যানসেন প্রথম কানাডিয়ান হিসেবে এই অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। এর মাধ্যমে মহাকাশ অনুসন্ধানকে আরও বৈশ্বিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার প্রয়াস স্পষ্ট।

তবে এত বড় ও জটিল অভিযানে কিছু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। মহাকাশযানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় ত্রুটি ধরা পড়ে, যার ফলে নভোচারীদের বিকল্প ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়। পানীয় জলের সরবরাহ ব্যবস্থাতেও সমস্যা দেখা দেওয়ায় আগাম জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া কেবিনের তাপমাত্রা প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকায় নভোচারীরা অতিরিক্ত পোশাক ব্যবহার করতে বাধ্য হন। যদিও এসব সমস্যা দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেওয়া হয়েছে এবং মিশনের অগ্রগতিতে কোনো বড় বাধা তৈরি হয়নি।

পৃথিবী ছেড়ে দূরে সরে যাওয়ার সময় নভোচারীরা এক বিরল অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। নিম্ন কক্ষপথে থাকা মহাকাশ স্টেশনের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃতভাবে পৃথিবীকে দেখা যায়—পুরো মহাদেশ, সমুদ্রের বিস্তার এমনকি দক্ষিণ মেরুও স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। এই অভিজ্ঞতাকে ‘ওভারভিউ ইফেক্ট’ বলা হয়, যা মহাকাশচারীদের মানসিকভাবে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ‘ওরিয়ন’ চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছে তার দূর প্রান্ত অতিক্রম করবে। সেই সময় মহাকাশযানটি এমন একটি অবস্থানে থাকবে, যেখান থেকে সূর্যগ্রহণের মতো বিরল দৃশ্যও দেখা যেতে পারে। এরপর ‘ফ্রি-রিটার্ন’ গতিপথে সেটি আবার পৃথিবীর দিকে ফিরে আসবে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী ১০ এপ্রিল প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে।

‘আর্টেমিস-২’ শুধু একটি পরীক্ষামূলক অভিযান নয়, এটি ভবিষ্যতের মহাকাশ অনুসন্ধানের ভিত্তি তৈরি করছে। চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা এবং শেষ পর্যন্ত মঙ্গল গ্রহে মানুষের অভিযান—এই সমস্ত বৃহৎ পরিকল্পনার প্রথম বাস্তব ধাপ এই মিশন।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এবং অন্যান্য অংশীদার সংস্থাগুলিও এই প্রকল্পে যুক্ত রয়েছে। ফলে ‘আর্টেমিস’ কর্মসূচি এখন শুধুমাত্র একটি দেশের নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির মহাকাশ অভিযানের প্রতীক হয়ে উঠছে।

সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, ‘আর্টেমিস-২’ মানব ইতিহাসে দীর্ঘতম বিরতির পর গভীর মহাকাশে মানুষের প্রত্যাবর্তনের সফল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং আগামী দিনের আরও সাহসী অভিযানের পথ প্রশস্ত করবে।

হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য




 

 rajesh pande