
কাঠমান্ডু, ২৭ মে (হি.স.) : নেপালের বৃহত্তম ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র বিপি কৈরালা মেমোরিয়াল ক্যানসার হাসপাতালে ক্যানসারের গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু জরুরি ওষুধের ঘাটতির প্রভাব এবার নেপালের হাসপাতালেও পড়েছে। এর ফলে বহু রোগী চরম সমস্যার মুখে পড়েছেন।
বুধবার হাসপাতালের মেডিক্যাল অনকোলজি বিভাগের প্রধান ডাঃ গুরু শরণ শাহ জানিয়েছেন, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ক্যানসার চিকিৎসার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিপি কৈরালা মেমোরিয়াল ক্যানসার হাসপাতালের পরিষেবায়।
তিনি বলেন, শুধু কেমোথেরাপির কার্যকারিতাই নয়, বাজারে নিম্নমানের ওষুধের ব্যবহারও রোগীদের স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে কার্বোপ্লাটিন এবং সিসপ্লাটিন ওষুধের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। ডাঃ শাহের দাবি, এই সংকট শুধুমাত্র নেপালে নয়, বিশ্বব্যাপী দেখা দিয়েছে। এই ওষুধ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বা এপিআই-এর আন্তর্জাতিক সরবরাহ কমে যাওয়াই এর মূল কারণ। আগামী দিনে অক্সালোপ্লাটিনেরও ঘাটতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
ডাঃ শাহ জানান, এই ওষুধগুলি ক্যানসারের কেমোথেরাপি চিকিৎসার মূল ভিত্তি। এগুলি ছাড়া সম্পূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি কার্যকরভাবে চালানো সম্ভব নয়। ফলে রোগীরা মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং রোগ নিরাময়ের হারও কমে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
তিনি আরও জানান, অনেক রোগী প্রতিবেশী দেশ বা বাইরের বাজার থেকে ওষুধ সংগ্রহ করছেন। তবে এর মধ্যে বহু ওষুধ নেপালের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ দফতরে নথিভুক্ত নয়। কিছু ওষুধের সিল খোলা অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে এবং শুল্ক প্রক্রিয়া এড়িয়ে সেগুলি আনা হচ্ছে বলেও অভিযোগ।
ডাঃ শাহ বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হল সংরক্ষণের তাপমাত্রা। অধিকাংশ ক্যানসারের ওষুধ ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে হয়। কিন্তু চিতওয়ানের মতো উষ্ণ এলাকায় ৩৬-৩৭ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ব্যাগে করে আনা ওষুধের কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। এতে উপকারের বদলে ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে।
হাসপাতালে ডে-কেয়ার ও ওয়ার্ড মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০০ রোগীর কেমোথেরাপির প্রয়োজন হয়। কিন্তু কার্বোপ্লাটিন ও সিসপ্লাটিনের মতো ওষুধের বিকল্প সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে চিকিৎসার মান নিয়ে আপস করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
ডাঃ শাহ অভিযোগ করেছেন, কিছু বেসরকারি ওষুধ বিক্রেতা ঘাটতিপূর্ণ ওষুধ দেওয়ার বদলে রোগীদের বাধ্য করছেন অন্য সব ওষুধও তাদের দোকান থেকেই কিনতে। তিনি নেপাল সরকার এবং ওষুধ নিয়ন্ত্রণ দফতরের কাছে চোরাচালান ও বাজারে অনিয়মের বিরুদ্ধে কড়া নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।
হাসপাতালের প্রাক্তন কার্যনির্বাহী পরিচালক ডাঃ শিবজি পৌডেল জানান, কার্বোপ্লাটিন এবং সিসপ্লাটিনের সরবরাহ ছয় মাস আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তিন মাস আগে পর্যন্ত যে সিসপ্লাটিন মজুত ছিল, তা মাত্র অর্ধেক রোগীর জন্য যথেষ্ট ছিল। বর্তমানে সেই মজুতও সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গিয়েছে।
তিনি জানান, কার্বোপ্লাটিনের মজুতও ১৫ মে পর্যন্ত ছিল, কিন্তু এখন তা ফুরিয়ে গিয়েছে। সরবরাহকারী সংস্থা কাঁচামালের অভাবের কারণ দেখিয়ে উৎপাদন বন্ধ থাকার কথা হাসপাতালকে জানিয়েছে। তবে একটি বাংলাদেশি সংস্থার মাধ্যমে নেপালের জন্য দু’-তিন মাসের প্রয়োজন মেটানোর মতো ওষুধ আমদানি করা হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই তা হাসপাতালে পৌঁছতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ক্যানসার হাসপাতালের কার্যনির্বাহী পরিচালক ডাঃ উমেশ নেপালও স্বীকার করেছেন যে হাসপাতালে বর্তমানে কার্বোপ্লাটিন ও সিসপ্লাটিন নেই। তিনি জানান, বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রককে জানানো হয়েছে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছেও সাহায্য চাওয়া হয়েছে। শিশুদের জন্য বিনামূল্যে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে কিছু ওষুধ মজুত রয়েছে, সেগুলি অন্য রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহারের অনুমতি চাওয়া হয়েছে।
ডাঃ নেপাল বলেন, শিশুদের জন্য বরাদ্দ এই ওষুধগুলির মেয়াদ ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত রয়েছে। বিশেষ অনুমতি মিললে তা অন্য রোগীদের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যেতে পারে। তিনি জানান, স্বাস্থ্য পরিষেবা বিভাগের কাছেও কিছু পরিমাণ ওষুধ রয়েছে। সেগুলি অনুমোদন সাপেক্ষে পাওয়া গেলে রোগীরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য