
নয়াদিল্লি, ২৬ জুলাই (হি.স.): কার্গিল বিজয় দিবসে দেশের বীর জওয়ানদের স্মরণ, আত্মনির্ভর ভারত গড়ার পথে দেশের অগ্রগতি, জল সংরক্ষণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খেলাধুলো, নারীশক্তি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ অভিযান—রবিবার ‘মন কি বাত’-এর ১৩৬-তম পর্বে একাধিক বিষয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
কার্গিল বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের জীবনে এমন কিছু তারিখ আছে, যা মনে রাখার জন্য ক্যালেন্ডারের দিকে তাকাতে হয় না। ২৬ জুলাই তেমনই একটি দিন। আজ কার্গিল বিজয় দিবস। এই দিনটি আমাদের গর্বে পূর্ণ করে তোলে। এই দিনটি আমাদের বীর সৈনিকদের অসামান্য সাহসিকতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কার্গিলের সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ, প্রতিকূল আবহাওয়া কিংবা শত্রুপক্ষের সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ—আমাদের সৈনিকরা এসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। তবুও, যে কোনও চ্যালেঞ্জের চেয়েও তাঁদের মনোবল ছিল অনেক বেশি শক্তিশালী। মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে তাঁরা নিজেদের সর্বস্ব উৎসর্গ করেছিলেন।” কার্গিল বিজয় দিবসে সকল বীর শহীদ ও বীর সৈনিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি জানান, এ বছর একটি বিশেষ ‘শৌর্য বিজয় যাত্রা’র আয়োজন করা হয়েছে। ১৪ জুলাই দিল্লির জাতীয় যুদ্ধ স্মারক থেকে শুরু হওয়া মোটরবাইক যাত্রাটি দ্রাসের কার্গিল যুদ্ধ স্মারকে গিয়ে পৌঁছাবে। ‘এক যাত্রা, এক দেশ, এক অভিবাদন’—এই বার্তা নিয়ে আয়োজিত এই যাত্রা দেশের জন্য করা আত্মত্যাগ কখনও বিস্মৃত না হওয়ার কথাই মনে করিয়ে দেয় বলে জানান তিনি।
আত্মনির্ভরতার পথে এগোচ্ছে ভারত
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের যুব সমাজের জন্য তিনি গর্বিত। তাঁরাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ভারতীয় নৌবাহিনীতে সদ্য অন্তর্ভুক্ত ‘আইএনএস মহেন্দ্রগিরি’-র প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, অত্যাধুনিক এই যুদ্ধজাহাজটি ভারতেই নকশা ও নির্মাণ করা হয়েছে এবং এতে ৭৫ শতাংশেরও বেশি দেশীয় উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। এটি ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর ক্রমবর্ধমান শক্তির প্রতীক।
তিনি জানান, চলতি মাসে ডিআরডিও সফলভাবে ‘পিনাকা লং রেঞ্জ গাইডেড রকেট’-এর পরীক্ষা চালিয়েছে। এই সাফল্য বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। দু’-তিন দিন আগেই ডিআরডিও ‘কুশা’ ক্ষেপণাস্ত্রেরও সফল পরীক্ষা করেছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিরক্ষা উৎপাদন, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রফতানি কিংবা বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলির সঙ্গে রাজনৈতিক সহযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই ভারত ক্রমাগত নতুন উচ্চতা স্পর্শ করছে। ইন্দোনেশিয়া সফরের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, সেখানে ব্রহ্মোস ও অস্ত্রা ক্ষেপণাস্ত্র সংক্রান্ত একটি বড় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভারতের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির প্রতি বিশ্বের আস্থা ক্রমশ বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জল সংরক্ষণে জোর
জল সংরক্ষণের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ৪ জুলাই থেকে সারা দেশে ‘ক্যাচ দ্য রেইন’ নামে একটি বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। এই অভিযানের আওতায় বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ জলস্তর পুনরুদ্ধার, পুরনো জলাধার ও জলের উৎসগুলির পুনরুজ্জীবন এবং বৃক্ষরোপণের কাজে নতুন গতি সঞ্চার করা হচ্ছে। গ্রাম ও শহর, পঞ্চায়েত ও সামাজিক সংগঠন—সর্বত্র মানুষ উৎসাহের সঙ্গে এই অভিযানে অংশগ্রহণ করছেন বলে জানান তিনি।
খেলাধুলোয় তরুণদের সাফল্যের প্রশংসা
কমনওয়েলথ গেমসের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্লাসগোতে কমনওয়েলথ গেমস শুরু হয়েছে এবং দেশের মানুষ ভারতীয় দলের প্রতি শুভকামনা জানাচ্ছেন। প্রতিটি খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদ যেন অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করে মানুষের হৃদয় জয় করেন—এই প্রত্যাশার কথা জানান তিনি।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে খেলাধুলোর ক্ষেত্রে দেশের তরুণরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। পিভি সিন্ধু ব্যাডমিন্টনে জাপান ওপেন খেতাব জয়ী প্রথম ভারতীয় হয়েছেন। এছাড়া ভারতীয় নারী ক্রিকেট দল লন্ডনের লর্ডস স্টেডিয়ামে তাদের প্রথম টেস্ট ম্যাচ জিতেছে—যাকে তিনি ঐতিহাসিক জয় বলে উল্লেখ করেন।
বিজ্ঞানে ভারতের অগ্রগতির কথা
বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ভারতের অগ্রগতির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত রবিবার ‘বিক্রম-১’-এর সফল উৎক্ষেপণ দেশের প্রতিটি নাগরিকের মনে গর্বের সঞ্চার করেছে। এটি ভারতের প্রথম বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি রকেট। তরুণ উদ্ভাবকরা অসাধারণ দক্ষতা, একাগ্রতা ও ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে পাঁচজন ভারতীয় শিক্ষার্থীই স্বর্ণপদক জিতে ভারত প্রথম স্থান অধিকার করেছে। রসায়ন অলিম্পিয়াডেও সমস্ত ভারতীয় শিক্ষার্থী স্বর্ণপদক জিতেছে। জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা পদক জিতেছে, যার মধ্যে একটি স্বর্ণপদকও রয়েছে। গণিত অলিম্পিয়াডে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা দুটি স্বর্ণ ও চারটি রৌপ্য পদক জয় করেছে বলে জানান তিনি।
দক্ষতা ও ইচ্ছাশক্তির গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যখন দক্ষতা ও কোনও কিছু করার ইচ্ছা থাকে, তখন সব পথই সহজ হয়ে যায়।” কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী মাদুর ‘ওয়াগু’-কে নতুন করে বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, শ্রীনগরের গোলাম হোসেন ও তাঁর মেয়ে তানজিলা এই ঐতিহ্যকে নতুন জীবন দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। নলখাগড়া ও ধানের খড় দিয়ে তৈরি এই মাদুরের ঐতিহ্য বহু শতাব্দী পুরনো।
উত্তর প্রদেশের বিজনোর জেলার লাখিওয়ালা গ্রামের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের তৈরি ‘বিদুর প্রেরণা স্বদেশি ভেষজ চা’-র কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। লেমনগ্রাস, গিলয়, যষ্টিমধু, তুলসী, কাঁচা হলুদ, দারুচিনি, এলাচ ও মৌরির মতো প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি এই চা মাত্র এক লক্ষ টাকা পুঁজি নিয়ে যাত্রা শুরু করে এখন দেশের বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠানে পৌঁছে গিয়েছে বলে জানান তিনি।
পরিবেশ রক্ষায় জনঅংশগ্রহণের প্রশংসা
আহমেদাবাদের ভাইজ এলাকায় ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষের অংশগ্রহণে মাত্র এক ঘণ্টায় ৩ লক্ষ ৫০ হাজারেরও বেশি চারাগাছ রোপণের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী বছরগুলিতে এই চারাগাছগুলি একটি ঘন শহুরে বনাঞ্চল গড়ে তুলবে বলে জানান তিনি। এই উদ্যোগটি গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নথিভুক্ত হয়েছে।
গুজরাটের গির অরণ্যে প্রায় ৬০ বছর পর ‘ইন্ডিয়ান গ্রে হর্নবিল’ পাখির পুনরায় বাসা বাঁধার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘদিনের সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার ফলেই এই সাফল্য এসেছে বলে জানান তিনি। হর্নবিলকে ‘বনের কৃষক’ বলা হয়, কারণ তারা ফল খেয়ে দূর-দূরান্তে বীজ ছড়িয়ে দেয় এবং নতুন গাছ জন্মাতে সাহায্য করে।
স্থানীয় মাটির গণেশ প্রতিমা ব্যবহারের আহ্বান
গণেশ প্রতিমা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তাঁর আগের অনুরোধের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। প্লাস্টার অফ প্যারিস বা বিদেশ থেকে আমদানি করা প্রতিমার পরিবর্তে দেশের প্রাকৃতিক মাটি দিয়ে তৈরি গণেশ প্রতিমা পুজো করার আহ্বান জানান তিনি। স্থানীয় মাটি দিয়ে তৈরি গণেশ প্রতিমা প্রতিষ্ঠার জন্য বহু মানুষ তাঁর অনুরোধ গ্রহণ করেছেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
বিহারের সীতামঢ়িতে ‘বর্জ্য থেকে সম্পদ’-এর উদাহরণ তুলে ধরে তিনি জানান, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করে বেঞ্চ তৈরি করা হচ্ছে। একটি বেঞ্চ তৈরিতে প্রায় ৪০ কেজি একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। সরকারি স্কুল, পার্ক ও জনসমাগমস্থলে এই বেঞ্চ বসানো হচ্ছে।
তাঁত ও স্থানীয় শিল্পকে উৎসাহ দেওয়ার আহ্বান
আগামী ৭ আগস্ট জাতীয় তাঁত দিবস উপলক্ষে তাঁতি ভাই-বোনদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও কঠোর পরিশ্রমকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, তাঁতের তৈরি প্রতিটি পোশাক কোনও একটি অঞ্চল, সম্প্রদায় এবং এর সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষের গল্প তুলে ধরে। হস্তশিল্পকে উৎসাহিত করে তাঁতিদের সম্মান জানাতে এবং ‘ভোকাল ফর লোকাল’-এর ভাবনাকে আরও জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।
বাবা-মা ই প্রথম শিক্ষক
গুরু পূর্ণিমার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাবা-মায়েরাই সন্তানের প্রথম শিক্ষক। স্কুলের শিক্ষকরা জ্ঞান ও শিক্ষার উপহার দেন। গুরু পূর্ণিমা সমস্ত শিক্ষক ও গুরুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি উপলক্ষ বলে উল্লেখ করে দেশের সমস্ত শিক্ষক ও গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি।
প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ভারতরত্ন ড. এ পি জে আব্দুল কালামকেও স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। ২৭ জুলাই তাঁর প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে কালামের শিক্ষকের ভূমিকার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিশু ও তরুণদের বড় স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করতেন তিনি।
‘হর ঘর তিরঙ্গা’ অভিযান এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান
স্বাধীনতা দিবসের আগে ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ অভিযানকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ১৫ আগস্ট প্রতিটি ভারতবাসীর জন্য গর্বের দিন। দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ করা অগণিত বীরকে স্মরণ করার দিন এটি। তাঁদের ত্যাগ ও নিষ্ঠার কারণেই দেশের হাতে রয়েছে তিরঙ্গা, যা সংবিধানের আদর্শকে মূর্ত করে তোলে।
গত কয়েক বছরে ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ অভিযান গোটা দেশকে এক অসাধারণ উদ্দীপনায় ঐক্যবদ্ধ করেছে বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বছরও অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে এই অভিযানকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের বাড়িতে তিরঙ্গা উত্তোলন করতে হবে। দেশবাসীকে ‘মাইগভ’-এ তাঁদের মতামত ও পরামর্শ ভাগ করে নেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌমি বৈদ্য