এক্সক্লুসিভ : বাংলায় ১১ লক্ষেরও বেশি ভুয়ো রেশন কার্ড বাতিল, গত ১৫ বছরে আনুমানিক ক্ষতি ৩,৬০০ কোটি টাকা
কলকাতা, ২৯ সেপ্টেম্বর (হি.স.) : পশ্চিমবঙ্গে পূর্ববর্তী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালে গণবণ্টন ব্যবস্থায় (পিডিএস) ব্যাপক দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এল। রাজ্যে বিজেপির নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর খাদ্যাবণ্টন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে বড়সড় পদক
राशन डिपो को बंद करते हुए ग्रामीण


কলকাতা, ২৯ সেপ্টেম্বর (হি.স.) : পশ্চিমবঙ্গে পূর্ববর্তী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালে গণবণ্টন ব্যবস্থায় (পিডিএস) ব্যাপক দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এল। রাজ্যে বিজেপির নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর খাদ্যাবণ্টন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে বড়সড় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে এ পর্যন্ত রাজ্যে ১১.১২ লক্ষেরও বেশি ভুয়ো রেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে। অভিযোগ, মৃত ব্যক্তি এবং বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের নামে থাকা এই কার্ডগুলিকে ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ভর্তুকিযুক্ত রেশন তুলে খোলা বাজারে পাচার করা হচ্ছিল। গত ১৫ বছরের মধ্যে এটিই পিডিএস ব্যবস্থার অন্যতম বড় ও সুসংগঠিত কেলেঙ্কারি বলে মনে করা হচ্ছে।

রাজ্যের খাদ্য ও সরবরাহ দফতরের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গিয়েছে, রেশন কার্ড বাতিলের প্রক্রিয়াটি গত ১ এপ্রিল থেকে শুরু হলেও, জুনে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই পরিচ্ছন্নতা অভিযানে বিশেষ গতি এসেছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে সমস্ত মৃত, স্থানান্তরিত বা নকল ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই খাদ্য দফতর এই ভুয়ো রেশন কার্ডগুলি ব্লক ও বাতিল করার কাজ চালাচ্ছে।

খাদ্য দপ্তরের এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, এ পর্যন্ত বাতিল হওয়া ১১.১২ লক্ষ কার্ডের সিংহভাগই মৃত ব্যক্তিদের নামে ছিল। অভিযোগ, গত ১৫ বছরে রাজ্যে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় একটি শক্তিশালী অসাধু চক্র গড়ে উঠেছিল। মৃত ব্যক্তিদের নথি খাতায়-কলমে ‘জীবন্ত’ দেখিয়ে প্রতি মাসে শত শত টন চাল ও গম তুলে নিত রেশন মাফিয়া ও অসাধু ব্যবসায়ীদের জোট। পরবর্তীকালে সেই খাদ্যশস্য খোলা বাজারে আকাশছোঁয়া দামে বিক্রি করা হতো। উল্লেখ্য, এই বহুচর্চিত মেগা রেশন কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে রাজ্যের প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককেও গ্রেফতার হতে হয়েছিল।

বাতিল হওয়া এই ১১.১২ লক্ষ কার্ডের মাধ্যমে রাজ্য কোষাগারের ক্ষতির হিসেব কষলে দেখা যাচ্ছে, অঙ্কটা অত্যন্ত বিশাল। একটি সাধারণ রেশন কার্ডে গড়ে প্রতি মাসে অন্তত ৫ কেজি খাদ্যশস্য মিলত। খোলা বাজারে এর ন্যূনতম মূল্য কেজি প্রতি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা ধরলেও, প্রতি মাসে প্রায় ১৬ থেকে ২০ কোটি টাকার খাদ্যশস্য লুট হতো। এই হিসেবে গত ১৫ বছরে (১৮০ মাসে) কেবল এই ১১ লক্ষ ভুয়ো কার্ডের মাধ্যমেই সরকারি কোষাগারের প্রায় ৩,৬০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-এর প্রাথমিক অনুমান, সমগ্র পিডিএস কেলেঙ্কারির পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

খাদ্য দফতরের আধিকারিকেরা স্পষ্ট করেছেন, মৃতদের কার্ড বাতিলের কাজ শেষ হওয়ার পর ভুয়ো নথির ভিত্তিতে নেওয়া কার্ডগুলির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দফায় তদন্ত শুরু হবে। বিশেষ করে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা কীভাবে নথি জোগাড় করে সুফলভোগী হয়ে উঠল, সে বিষয়ে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো দুর্নীতি নির্মূল করে প্রকৃত ও অভাবী নাগরিকদের কাছে সরকারি ভর্তুকির সুবিধা পৌঁছে দেওয়া।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

পিডিএস ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে গবেষণারত বিশেষজ্ঞ ফুলচাঁদ ভারতী এই ঘটনাকে কেবল প্রশাসনিক গাফিলতি বলতে নারাজ। তাঁর মতে, এটি ক্ষমতার ছত্রছায়ায় পরিচালিত এক সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক অপরাধ। তিনি বলেন, “যখন ১১ লক্ষের বেশি মৃত মানুষের নামে বছরের পর বছর রেশন তোলা হয়, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে পুরো ব্যবস্থাটি উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল। ১৫ বছর ধরে হাজার হাজার কোটি টাকার খাদ্যশস্য কালোবাজারে পাচার হলো আর সরকার নীরব থাকল—এর দায় সরাসরি তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বের ওপরই বর্তায়।”

২০১৪ সালে তৃণমূল সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ফুলচাঁদ ভারতী আরও দাবি জানান, নতুন সরকারের উচিত এই ঘটনার নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করানো। রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি যেসব অসাধু আমলা ও আধিকারিক এই অসাধু চক্রকে মদত দিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

হিন্দুস্থান সমাচার / সন্তোষ মধুপ




 

 rajesh pande