
- ড. মায়ঙ্ক চতুর্বেদী
স্বামী গোবিন্দ দেব গিরি জি মহারাজের আধ্যাত্মিক দৃষ্টি, রাম মন্দির আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, ট্রাস্টের নতুন প্রশাসনিক দায়িত্ব, আর্থিক স্বচ্ছতা, সিইও-র সঙ্গে সমন্বয়, রাম মন্দিরের ভবিষ্যৎ ভূমিকা এবং রাষ্ট্রগঠনের মতো বিষয়গুলি এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে আপনাদের সকলের সামনে উপস্থাপিত করা হয়েছে।
প্রশ্ন: শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আপনার নতুন দায়িত্বকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
উত্তর: এটি আমার কাছে কোনও পদ বা অধিকারের বিষয় নয়, বরাবরের মতোই এটি সেবার একটি সুযোগ। শ্রীরাম জন্মভূমির বিষয়টি কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত। রাম মন্দির নির্মাণ একটি ঐতিহাসিক পর্যায় ছিল, তবে মন্দিরের ব্যবস্থাপনা, তার মর্যাদা, আগত ভক্তদের সুযোগ-সুবিধা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যাপক কার্যক্রমকে সুশৃঙ্খল করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমি এটিকে প্রভু শ্রীরামের সেবা এবং রাষ্ট্রসেবা হিসেবে দেখি।
প্রশ্ন: আপনি আগে ট্রাস্টের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন। এখন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আপনার ভূমিকা কীভাবে পরিবর্তিত হবে?
উত্তর: কোষাধ্যক্ষ হিসেবে মূলত আর্থিক শৃঙ্খলা, সম্পদ এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজের পরিধি আরও ব্যাপক। ট্রাস্টের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, বিভিন্ন কমিটি ও ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়, প্রশাসনিক কাজকর্মের পর্যবেক্ষণ এবং মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এর অন্তর্ভুক্ত। সচেষ্ট থাকব যেন প্রতিটি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, শৃঙ্খলা এবং দায়বদ্ধতা দেখা যায়।
প্রশ্ন: ট্রাস্ট প্রথমবারের মতো একটি পেশাদার প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে প্রাক্তন এয়ার মার্শাল জীতেন্দ্র মিশ্রকে সিইও করেছে। আপনি এটিকে কীভাবে দেখছেন?
উত্তর: বর্তমান সময়ে এত বড় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র পরিচালনা করা ব্যাপক একটি বিষয়। এখানে ভক্তদের সংখ্যা, নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সুযোগ-সুবিধা এবং অনেক প্রশাসনিক দিক রয়েছে। তাই আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আধুনিক প্রশাসনিক দক্ষতার সমন্বয় প্রয়োজন। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগ এই হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আমরা সবাই নিজ নিজ দায়িত্বের মাধ্যমে একই উদ্দেশ্য পূরণ করব।
প্রশ্ন: ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কি আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং পেশাদার প্রশাসনের প্রয়োজন রয়েছে?
উত্তর: অবশ্যই রয়েছে। ভারতীয় ঐতিহ্যে ধর্ম এবং ব্যবস্থাপনা কখনওই একে অপরের বিরোধী ছিল না। রামরাজ্যের দর্শনেও সুশাসন, শৃঙ্খলা, জনকল্যাণ এবং দায়বদ্ধতা ছিল প্রধান উপাদান। আধুনিক প্রযুক্তি এবং ব্যবস্থাপনার মাধ্যমগুলিকে যদি মন্দিরের সেবা, ভক্তদের সুবিধা এবং স্বচ্ছতার জন্য ব্যবহার করা হয়, তবে তা আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
প্রশ্ন: জুলাই ২০২৬-এ প্রণামীর টাকা চুরির বিতর্কের পর ট্রাস্টের আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। আপনি এই পুরো ঘটনাটিকে কীভাবে দেখছেন?
উত্তর: যেখানে বিপুল সংখ্যক ভক্ত আসেন এবং বিপুল পরিমাণে দান ও প্রণামী গৃহীত হয়, সেখানে ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত কঠোর শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। যদি কোথাও কোনও ত্রুটি সামনে আসে, তবে তা সংশোধন করা উচিত। তথ্যপ্রমাণ ছাড়া কারও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা সমীচীন নয়। কিন্তু ব্যবস্থার ত্রুটি দূর করা আমাদেরই দায়িত্ব। আমাদের লক্ষ্য, এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হওয়া উচিত যেখানে প্রতিটি প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, নিয়ন্ত্রিত এবং জবাবদিহিমূলক হবে।
প্রশ্ন: নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কি আর্থিক স্বচ্ছতাকে আরও জোরদার করা হবে?
উত্তর: স্বচ্ছতা যেকোনও সামাজিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্রের সঙ্গে কোটি কোটি মানুষের আবেগ, অনুভূতি জড়িয়ে আছে, তাই অর্থের ব্যবহার যেন সঠিক উদ্দেশ্যে হয়, প্রতিটি প্রক্রিয়া যেন সুশৃঙ্খল হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে যেন জবাবদিহিতা বজায় থাকে, তা নিশ্চিত করাই আমাদের অগ্রাধিকার হবে।
প্রশ্ন: আপনার জীবনে ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন এবং প্রবচন খুব অল্প বয়সেই শুরু হয়েছিল। ১৭ বছর বয়সে প্রথম প্রবচন থেকে শুরু করে আজ রাম মন্দির ট্রাস্টের দায়িত্ব পর্যন্ত এই যাত্রাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
উত্তর: আমি যখন ১৭ বছর বয়সে প্রথমবার ভগবদ্গীতা এবং শ্রীমদ্ভাগবতের ওপর বলতে শুরু করেছিলাম, তখন আমি কখনও কল্পনাও করিনি যে জীবন আমাকে এভাবে প্রভু শ্রীরামের সেবা করার সুযোগ দেবে। আমার কাছে এই যাত্রা ব্যক্তিগত কোনও সাফল্য নয়, এটি ভারতীয় জ্ঞান ঐতিহ্যের শক্তি এবং সাধু-সন্তদের আশীর্বাদের যাত্রা। আমি বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত এবং গীতা যতখানি বোঝার চেষ্টা করেছি, ততই অনুভব করেছি যে ভারতীয় সংস্কৃতির মূল বার্তা সমাজ ও মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত।
প্রশ্ন: আপনি বেদের অধ্যয়ন এবং প্রচারের জন্য মহর্ষি বেদব্যাস প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন। আজকের নতুন প্রজন্মের জন্য বেদ এবং ভারতীয় দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা কী?
উত্তর: বেদ আমাদের জন্য কেবল প্রাচীন (আদি, অনাদি) গ্রন্থ নয়, প্রকৃতপক্ষে সেগুলিতে জীবন, প্রকৃতি, সমাজ এবং চেতনাকে দেখার একটি ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। বর্তমান প্রজন্ম আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। তাদের নিজেদের শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত করাও আবশ্যক। বেদ, উপনিষদ এবং গীতা মানুষকে তাদের জীবনের উদ্দেশ্য, কর্তব্য এবং আত্মশাসন বোঝার দৃষ্টিভঙ্গি দেয়, তাই এদের অধ্যয়ন আজও ততটাই প্রাসঙ্গিক, যতটা অতীতে ছিল।
প্রশ্ন: রাম মন্দির আন্দোলন থেকে শুরু করে মন্দির নির্মাণ পর্যন্ত আপনি একটি দীর্ঘ যাত্রা দেখেছেন। আজ যখন এই বিশাল মন্দির দৃশ্যমান, সেই যাত্রাকে আপনি কীভাবে স্মরণ করেন?
উত্তর: এই যাত্রা বহু প্রজন্মের সংকল্প, সংগ্রাম, সাধনা এবং অপেক্ষার যাত্রা। রাম মন্দির নির্মাণ সেই অসংখ্য মানুষের আবেগের ফল, যাঁরা নিজেদের জীবনে এটিকে একটি সংকল্প হিসেবে দেখেছিলেন। তাই মন্দিরের বিশালতা ও জাঁকজমকের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার পেছনের মূল ভাবনা ও আবেগ। আমাদের মনে রাখতে হবে যে রামের মন্দির যখন তৈরি হয়েছে, তখন রামের আদর্শও আমাদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।
প্রশ্ন: ২২ জানুয়ারি ২০২৪-এ রামললার প্রাণপ্রতিষ্ঠার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আপনার হাত থেকে প্রসাদ গ্রহণ করে তাঁর ১১ দিনের উপবাস ভঙ্গ করেছিলেন। সেই মুহূর্তটিকে আপনি কীভাবে স্মরণ করেন?
উত্তর: সেটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন এবং ঐতিহাসিক একটি মুহূর্ত। প্রধানমন্ত্রীজি প্রাণপ্রতিষ্ঠার আগে যেভাবে ১১ দিনের ব্রত ও শৃঙ্খলা পালন করেছিলেন, তা এই আয়োজনের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাকে প্রদর্শন করে। তিনি যখন প্রসাদ গ্রহণ করে উপবাস ভঙ্গ করেন, তখন আমার মনে হয়েছিল যে এটি কেবলমাত্র একজন ব্যক্তির মুহূর্ত নয়, বরং লক্ষ লক্ষ রামভক্তের বিশ্বাসের মুহূর্ত।
প্রশ্ন: আপনার কি মনে হয় রাম মন্দিরের প্রভাব অযোধ্যা ছাড়িয়ে ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেও পড়বে?
উত্তর: সত্যি বলতে, আপনার এই প্রশ্নটিই অনুচিত, কারণ শতাব্দী ধরে কেবল ভারতবর্ষে নয়, বিশ্বের বহু দেশে, প্রকৃতপক্ষে বলতে গেলে কোনও না কোনও রূপে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে প্রভু শ্রীরামের প্রভাব অযোধ্যার সীমানা পেরিয়ে আগে থেকেই বিদ্যমান। শ্রীরাম ভারতীয় সমাজের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের আদর্শ। রাম মন্দির এমন একটি কেন্দ্র হয়ে উঠছে যেখান থেকে সেবা, সংস্কার, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার অনুভূতি অবিরাম শক্তি পেতে থাকবে। রামের আদর্শ আমাদের আচরণে প্রতিফলিত হবে; এটাই সন্ত সমাজের প্রচেষ্টা।
প্রশ্ন: অযোধ্যায় প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক ভক্ত পৌঁছাচ্ছেন। আগামী দিনে সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ কী হবে?
উত্তর: ভক্তদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই অনেক দায়িত্ববোধ নিয়ে আসে। দর্শন ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, যাতায়াত, বাসস্থান, প্রসাদ, চিকিৎসা এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধাকে ক্রমাগত উন্নত করতে হবে। সেই সঙ্গে মন্দিরের আধ্যাত্মিক মর্যাদা এবং অযোধ্যার সাংস্কৃতিক পরিচয় অক্ষুণ্ণ ও সুরক্ষিত রাখা একটি বড় কাজ। আমাদের প্রচেষ্টা এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ভক্তরা সুবিধার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতাও লাভ করতে পারেন।
প্রশ্ন: রাম মন্দিরকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কোনও বৃহত্তর পরিকল্পনা কি আছে?
উত্তর: যেমন আমি বলেছি, প্রভু শ্রীরাম ভারতের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নন, তিনি বিষ্ণু, বিশ্বের অণু-পরমাণুতে ব্যাপ্ত। বিশ্বের বহু দেশে রামকথা ও রামায়ণের ঐতিহ্য রয়েছে। অযোধ্যাকে এমন একটি কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা উচিত, যেখানে ভারতের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বুঝতে পারে গোটা বিশ্ব। এর জন্য মন্দিরের সঙ্গে জ্ঞান, গবেষণা, সংস্কৃতি, ভারতীয় ভাষা এবং রামায়ণের বৈশ্বিক ঐতিহ্যকেও সামনে নিয়ে আসার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রশ্ন: আপনার মতে রামরাজ্যের আধুনিক অর্থ কী?
উত্তর: রামরাজ্যের অর্থকে কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা উচিত হবে না। রামরাজ্যের মূল ভাব হলো শাসনে যেন ন্যায় থাকে, সমাজে বিশ্বাস থাকে, ব্যক্তিতে কর্তব্যবোধ থাকে এবং সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তির কল্যাণের চিন্তা থাকে। রাম নিজে ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও জনকল্যাণকে সর্বোচ্চ মনে করেন। সন্ত তুলসীদাসের ভাষায় বললে— পরোপকারের চেয়ে বড় কোনও ধর্ম নেই, আর অপরকে কষ্ট দেওয়ার চেয়ে বড় কোনও অধর্ম নেই। আজ যদি আমরা রামরাজ্যের কথা বলি, তবে আমাদের এই মূল্যবোধগুলিকেই আমাদের সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে বাস্তবায়িত করতে হবে। যেখানে— (দৈহিক দৈবিক ভৌতিক তাপ। রাম রাজ নহিঁ কাহুহি ব্যাপা॥ সব নর করহিঁ পরস্পর প্রীতি। চলহিঁ স্বধর্ম নিরত শ্রুতি নীতি) দেখা যাবে। আমাদের এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে— চারিউ চরন ধর্ম জগ মাহীঁ। পূরি রহা সপনেহুঁ অঘ নাহীঁ॥ রাম ভগবতি রত নর অরু নারী। সকল পরম গতি কে অধিকারী॥ অর্থাৎ ধর্ম নিজের চারটি চরণ (সত্য, পবিত্রতা, দয়া ও দান) নিয়ে জগতে পরিপূর্ণ থাকবে, স্বপ্নেও কোথাও পাপ থাকবে না। পুরুষ ও নারী সকলেই রামভক্তিতে পরায়ণ হবেন এবং সকলেই পরম গতি (মোক্ষ)-র অধিকারী হবেন। যেমনটি শ্রীরামের রাজত্বে বর্ণনা পাওয়া যায়— অল্পমৃত্যু নহিঁ কবনিউ পীরা। সব সুন্দর সব বিরুজ সরীরা॥ নহিঁ দরিদ্র কোউ দুঃখী ন দীনা। নহিঁ কোউ অবুধ ন লচ্ছন হীনা॥ সব নির্দম্ভ ধর্মরত পুনী। নর অরু নারী চতুর সব গুনী॥ সব গুনগ্য পণ্ডিত সব গ্যানী। সব কৃতগ্য নহিঁ কাপট সয়ানী॥ অর্থাৎ অল্প বয়সে কারও মৃত্যু হয় না, কারওর কোনও পীড়া হয় না। সকলের শরীর সুন্দর ও রোগমুক্ত। কেউ দরিদ্র নয়, দুঃখী নয় এবং দীনও নয়। কেউ মূর্খ নয় এবং শুভলক্ষণহীনও নয়। সকলেই দম্ভহীন, ধর্মপরায়ণ এবং পুণ্যাত্মা। পুরুষ ও নারী সকলেই চতুর ও গুণবান। সকলেই গুণের সমাদরকারী, পণ্ডিত এবং জ্ঞানী। সকলেই কৃতজ্ঞ (অপরের করা উপকার স্বীকারকারী), এবং কেউই প্রতারক নয়। প্রকৃতপক্ষে আধুনিক অর্থেও এবং ভবিষ্যতেও যা নিজের সময়ে আধুনিক হবে, সেই সময়েও রামরাজ্যের অর্থ অর্থাৎ এমন একটি সমাজব্যবস্থাই হবে, যার বর্ণনা আমরা সন্ত তুলসীদাস রচিত রামচরিতমানস বা বাল্মীকি রামায়ণে দেখতে পাই।
প্রশ্ন: আপনি সন্ন্যাসের পথ বেছে নিয়েছেন। একজন সন্তের জন্য এত বড় প্রশাসনিক দায়িত্ব কতটা চ্যালেঞ্জিং?
উত্তর: সন্ন্যাসের অর্থ সংসার থেকে পলায়ন নয়। ভারতীয় ঐতিহ্যে সন্ন্যাসের অর্থ বৃহত্তর সমাজের প্রতি সমর্পণও বটে। যখন কোনও দায়িত্ব ধর্ম ও সমাজের সেবায় সামনে আসে, তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া সন্ন্যাসের মনোভাব নয়। চ্যালেঞ্জ আছে, কিন্তু চ্যালেঞ্জের চেয়েও এটি সেবার একটি সুযোগ। এই প্রসঙ্গে আপনি শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হিসেবে আদি শংকরাচার্যজির জীবনের অধ্যয়ন করতে পারেন।
প্রশ্ন: আজকের যুবকদের জন্য আপনার সবচেয়ে বড় বার্তা কী?
উত্তর: যুবসমাজ তাদের আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে চলুক, কিন্তু নিজেদের সাংস্কৃতিক শেকড়ের সঙ্গে যেন যুক্ত থাকে। গীতা আমাদের কর্ম, শৃঙ্খলা এবং আত্মবিশ্বাসের বার্তা দেয়। যুবসমাজ যদি তাদের জীবনে জ্ঞান, চরিত্র, পরিশ্রম এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধকে স্থান দেয়, তবে ভারতের শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। আর তখন ভারত অর্থাৎ ‘বসুধৈব কুটুম্বকম্’ (সমগ্র বিশ্বই এক পরিবার), ভারত অর্থাৎ ‘সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ’ (সকলেই সুখী হোক), ভারত অর্থাৎ শান্তি, সহাবস্থান ও সদ্ভাব, ভারত অর্থাৎ ‘অহিংসা পরমো ধর্মঃ’, ভারত অর্থাৎ করুণায় শক্তি এবং শক্তিতে সংযম, ভারত অর্থাৎ জ্ঞান, বিজ্ঞান ও মানবকল্যাণ, ভারত অর্থাৎ প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ জীবন, ভারত অর্থাৎ ঐক্যের মধ্যে বৈচিত্র্য, ভারত অর্থাৎ সংস্কৃতির সম্মান এবং চিন্তার স্বাধীনতা, ভারত অর্থাৎ ‘চরৈবেতি-চরৈবেতি’- নিরন্তর এগিয়ে চলার সংকল্প, ভারত অর্থাৎ নিজের শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আধুনিকতার দিকে এগিয়ে চলা এক রাষ্ট্র, ভারত অর্থাৎ ‘সর্বজন হিতায়, সর্বজন সুখায়’ এবং ভারত অর্থাৎ সমগ্র মানবজাতিকে নিজের পরিবার বলে মনে করা সনাতন চেতনা।
প্রশ্ন: রাম মন্দির নির্মাণের পর এখন আপনার পরবর্তী বড় লক্ষ্য কী?
উত্তর: মন্দির নির্মাণ একটি মহান সাফল্য, কিন্তু যাত্রা এখানেই শেষ হয় না। মন্দির একটি প্রাণবন্ত আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কেন্দ্র। ভক্তদের জন্য সেরা ব্যবস্থা, ভারতীয় জ্ঞান ঐতিহ্যের সংরক্ষণ, সেবামূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার এবং রামের আদর্শকে সমাজজীবনের সঙ্গে যুক্ত করে আগামী দিনের বড় দায়িত্বগুলি বহন করে চলাই তো ধারাবাহিকতা। আপনি যে লক্ষ্যের কথা বলছেন, প্রভু আমাদের যে পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন, ভবিষ্যতেও তিনি যেখানে নিয়ে যেতে চান, সেখানে নিয়ে যাবেনই; আমরা তো প্রভুর দাস, এই দেহ দিয়ে যে কাজ সম্পন্ন করাতে চান, প্রভু তা করাতে থাকুন।
প্রশ্ন: পরিশেষে, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আপনার অগ্রাধিকার কী হবে?
উত্তর: আমার অগ্রাধিকার স্পষ্ট: রাম মন্দিরের মর্যাদা, ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা, ভক্তদের সুবিধা এবং শ্রীরামের আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সেবা। রাম মন্দির কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাসের প্রতীক। এই বিশ্বাস রক্ষা করা আমাদের সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব। মন্দির জাঁকজমকের সঙ্গে নির্মিত হয়েছে, এখন তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবস্থাপনা ও সেবার উৎকর্ষ প্রতিষ্ঠা করা আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য হওয়া উচিত। আমাদের চেষ্টা থাকবে যেন অযোধ্যায় আসা প্রতিটি মানুষ কেবল ভ্রমণের স্মৃতি নিয়ে ফিরে না যান, তিনি যেন প্রভু শ্রীরামের জীবনমূল্যবোধ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে এখান থেকে ফিরে যান।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌম্যজিৎ