
আগরতলা, ১৪ জানুয়ারি (হি.স.) : ত্রিপুরাজুড়ে বুধবার ঐতিহ্য ও ভক্তির আবহে পালিত হল মকর সংক্রান্তি, যা রাজ্যে পৌষ সংক্রান্তি নামে অধিক পরিচিত। রাজ্যের গ্রাম থেকে শহর—সর্বত্রই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণে উৎসবটি পরিণত হয় এক মিলনমেলায়। প্রাচীন রীতিনীতি, লোকাচার ও ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশ উপলক্ষ্যে এই উৎসব উদযাপিত হয়।
মঙ্গলবার রাত থেকেই সংক্রান্তি উৎসবের সূচনা হয়। গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন এলাকায় সারারাত পিকনিকের আয়োজন করা হয়। পরিবার ও প্রতিবেশীরা একত্রিত হয়ে শীতের রাতে ঐতিহ্যবাহী পিঠা-পুলি তৈরি, গল্পগুজব ও ভোরের আচার-অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকেন। নারকেল ভরা পুলি, তিলের পিঠা ও চালের তৈরি নানা মিষ্টান্ন ঘিরে ছিল উৎসবের প্রধান আকর্ষণ।
বুধবার ভোরবেলায় প্রথামাফিক স্নান সেরে সূর্যদেবের উদ্দেশ্যে পিঠা ও নৈবেদ্য অর্পণ করেন। গৃহস্থালির মহিলারা পরিবারের সুস্বাস্থ্য, সুখ ও সমৃদ্ধির কামনায় সূর্যোপাসনায় অংশ নেন। একইসঙ্গে বাড়ির উঠান ও প্রবেশপথে চালের গুঁড়ো দিয়ে আঁকা আলপনায় ফুটে ওঠে লোকশিল্পের নান্দনিকতা।
এদিন বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দল গঠন করে ভক্তরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ‘হরে কৃষ্ণ’ সহ ভক্তিগীতি পরিবেশন করেন। এই ভক্তিযাত্রা ধর্মীয় আবহকে আরও গভীর করে তোলে এবং সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা বহন করে।
সংক্রান্তির একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান ছিল ‘বুড়ির ঘর জ্বালানো’। খড় ও বাঁশ দিয়ে তৈরি প্রতীকী কুঁড়েঘর দাহের মাধ্যমে পুরনোকে বিদায় ও নতুনের আহ্বান জানানো হয়। গ্রামবাসীরা আগুনের চারপাশে সমবেত হয়ে প্রার্থনার মধ্য দিয়ে অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির জয় কামনা করেন।
উৎসবের শেষ পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয় বহু প্রতীক্ষিত ‘হরির লুট’। এই অনুষ্ঠানে মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবীণরা তিল্লাই, কদমা ও বাতাসার মত মিষ্টি ভক্তদের উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেন। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষ আনন্দের সঙ্গে সেই মিষ্টি কুড়াতে অংশ নেন, যা উৎসবের আনন্দকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।
পৌষ সংক্রান্তির এই উদযাপন ত্রিপুরার মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ঐক্যের প্রতিচ্ছবি হিসেবে ফুটে ওঠে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উত্তরাধিকারসূত্রে বহমান এই উৎসব রাজ্যের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করল। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে আগুনের শিখা, পিঠার মিষ্টি সুবাস ও ভক্তিগীতির ধ্বনি মিলেমিশে ত্রিপুরার আকাশে ছড়িয়ে পড়ে এক অনন্য উৎসবের আবহ।
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ