
দুর্গাপুর, ২১ মার্চ (হি.স.) : বছরের পর বছর উন্নয়নের ফিরিস্তি শুনে ক্লান্ত জঙ্গলমহলের আদিবাসী সমাজ। বিধানসভা ভোটের আগে পশ্চিম বর্ধমানের কাঁকসা ব্লকের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় ফের সামনে এসেছে বঞ্চনা, অনুন্নয়ন ও উপেক্ষার একাধিক অভিযোগ। পানীয় জল, শিক্ষা, বাসস্থান থেকে কর্মসংস্থান—প্রায় সব ক্ষেত্রেই সমস্যার কথা তুলে ধরছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ত্রিলোকচন্দ্রপুর, মলানদীঘি, বনকাটি-সহ কাঁকসা পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ জঙ্গলমহল এলাকায় নলকূপ থাকলেও অনেক জায়গায় জল পাওয়া যায় না। বহু পরিবার এখনও ভাঙা মাটির ঘরে ত্রিপল টাঙিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার তালিকাতেও জায়গা হয়নি তাঁদের।
শিল্পাঞ্চল লাগোয়া ঝিনুকগড় এলাকায় প্রায় ৭০টি আদিবাসী পরিবার বসবাস করে। স্থানীয়দের দাবি, শিল্পতালুক গড়ে ওঠার সময় চাষের জমি হারালেও কারখানায় পর্যাপ্ত কাজ পাননি এলাকার মানুষ। উল্টে মদ কারখানার দূষণে পরিবেশ আরও বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছে। জলজীবন প্রকল্পে ট্যাপকল বসানো হলেও অধিকাংশই অচল, কোথাও বা মাটির নীচে চাপা পড়ে রয়েছে।
একসময় কাঁকসা জঙ্গলমহলে শালপাতার থালা তৈরির কাজ বহু পরিবারের জীবিকার প্রধান ভরসা ছিল। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে মহিলাদের প্রশিক্ষণ ও মেশিন দেওয়া হলেও বর্তমানে বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় সেই কাজ প্রায় বন্ধ। প্লাস্টিক ও কাগজের বিকল্পের দাপটে শালপাতার ব্যবহার কমে যাওয়ায় আয় কমেছে বহু পরিবারের।
শিক্ষাক্ষেত্রেও একই সমস্যা প্রকট। সাঁওতালি ভাষার প্রাথমিক বিদ্যালয় তৈরি হলেও শিক্ষক স্বল্পতার কারণে পঠনপাঠন কার্যত ভেঙে পড়েছে। শনিবার কাঁঠালডাঙা গ্রামের বাসিন্দা সন্ন্যাসী মুর্মু বলেন, “প্রথমদিকে সাঁওতালি ভাষায় পড়াশোনা শুরু হওয়ায় ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ ছিল। এখন শিক্ষক না থাকায় স্কুলে উপস্থিতি অনেক কমে গেছে।” ফলে স্কুলছুটের সংখ্যাও বাড়ছে বলে অভিযোগ।
এছাড়া একলব্য ও রঘুনাথ মুর্মু স্কুলগুলিতেও সাঁওতালি ভাষার শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে। আদিবাসী সংগঠনগুলির অভিযোগ, পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও নজরদারির অভাবে এই শিক্ষা প্রকল্পগুলি কার্যকর হচ্ছে না।
পশ্চিমবঙ্গ আদিবাসী গাঁওতার আহ্বায়ক সুনীল সোরেনের দাবি, আদিবাসী শিক্ষাব্যবস্থা এখনও উপেক্ষিত। সাঁওতালি ভাষায় সুসংহত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা ও শিক্ষক নিয়োগের দাবি দীর্ঘদিনের। পাশাপাশি আদিবাসী এলাকায় বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং পৃথক প্রশাসনিক কাঠামোর দাবিও তুলেছেন তিনি।
রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে এই ইস্যুতে। বিজেপির অভিযোগ, উন্নয়নের নামে শুধুই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। অন্যদিকে তৃণমূলের দাবি, আদিবাসী উন্নয়নে সরকার একাধিক প্রকল্প চালু করেছে এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজও হয়েছে।
সব মিলিয়ে, বিধানসভা ভোটের আগে কাঁকসা জঙ্গলমহলে আদিবাসী সমাজের এই ক্ষোভ আগামী নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
হিন্দুস্থান সমাচার / জয়দেব লাহা