
কলকাতা, ১৪ এপ্রিল (হি.স.): কলকাতার দক্ষিণ-এ যাদবপুর বিধানসভা কেন্দ্র চলতি বিধানসভা নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এই কেন্দ্রে সাক্ষরতার হার যেমন বেশি, পাশাপাশি ভোটাররাও রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট সচেতন। এবার এখানে রাজনৈতিক ময়দানে ত্রিমুখী লড়াই তৃণমূল কংগ্রেস, ভারতীয় জনতা পার্টি এবং বামফ্রন্টের মধ্যে। যাদবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের একটি অংশ দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাতেও পড়েছে। এই এলাকাটি কলকাতা পৌরসভার ১০টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এবং এটি যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। মূলত শহুরে বাসিন্দাদের বাস এই এলাকায়।
রাজনৈতিকভাবে এই কেন্দ্র যেমন সচেতন, তেমনই শিক্ষা-সংস্কৃতিরও অন্যতম কেন্দ্র যাদবপুর। ১৯৫৫ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি যাদবপুরে রয়েছে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স, সেন্ট্রাল গ্লাস অ্যান্ড সেরামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট, এস. এন. বোস ন্যাশনাল সেন্টার ফর বেসিক সায়েন্সেস এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ কেমিক্যাল বায়োলজির মতো জাতীয় স্তরের প্রতিষ্ঠান।
এই নির্বাচনী ক্ষেত্রের রাজনৈতিক ইতিহাসও বেশ আকর্ষণীয়। একসময়ে এই নির্বাচনী এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে সিপিআই(এম)-এর শক্ত ঘাঁটি ছিল। ১৯৮৩ সালের উপনির্বাচন-সহ এখনও পর্যন্ত এখানে ১৫টি নির্বাচন হয়েছে, এর মধ্যে সিপিআই(এম) ১৩ বার জয়লাভ করেছে। এই আসন থেকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ১৯৮৭ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার এই আসনে জয়ী হয়েছিলেন। তবে, ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের মণীশ গুপ্ত তাঁকে ১৬ হাজার ৬৮৪ ভোটে পরাজিত করেন। তারপর থেকে যাদবপুরে ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের দেবব্রত মজুমদার সিপিআই(এম)-এর সুজন চক্রবর্তীকে ৩৮,৮৬৯ ভোটে পরাজিত করেন। এই নির্বাচনে বিজেপি তৃতীয় স্থান অধিকার করলেও, তাদের ভোটের শতাংশ সিপিআই(এম)-এর কাছাকাছি ছিল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল তাদের আধিপত্য বজায় রেখেছে। অন্যদিকে বিজেপি সিপিআই(এম)-কে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এখানে নিবন্ধিত ভোটার ছিলেন ২ লক্ষ ৭৯ হাজার ৮২৮ জন, যা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বেড়ে হয় ২ লক্ষ ৯৪ হাজার ১৮৬ জন। তবে ২০২৬ সালের এসআইআর-এর পর এই সংখ্যা কমে গেছে। এখানে প্রায় ১১.৬৮ শতাংশ তফসিলি এবং প্রায় ৮ শতাংশ মুসলমান ভোটার রয়েছেন। যাদবপুর একসময় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের কেন্দ্র ছিল, কিন্তু বামফ্রন্টের শাসনকালে অনেক শিল্প বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে কর্মসংস্থানের দিকটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমানে, এখানকার অর্থনীতি প্রধানত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ছোটখাটো ব্যবসা এবং অন্যান্য পরিষেবার উপর নির্ভরশীল।
২০২৬ সালের নির্বাচনে এখানে তৃণমূল কংগ্রেস আবারও দেবব্রত মজুমদারের উপরেই আস্থা রেখেছে। দেবব্রতবাবুর মত, বামফ্রন্টের শাসনকালে এই এলাকা ছিল হিংসার আখড়া। কিন্তু এখানে উন্নয়ন ও শান্তির পরিবেশ বিরাজ করছে। তিনি বিজেপিকে নিশানা করে বলেন, বাংলার ভোটাররা বিভাজনের রাজনীতি মেনে নেবে না। অন্যদিকে, ভারতীয় জনতা পার্টি অপেক্ষাকৃত নতুন মুখ শর্বরী মুখার্জিকে প্রার্থী করেছে। তিনি তৃণমূলকে তীব্র আক্রমণ করে বলেন, রাজ্যের মানুষ মমতা ব্যানার্জির অপশাসনে বিদ্ধস্ত। তিনি বলেন, যাদবপুরে উন্নয়নের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু তৃণমূল কেবল দুর্নীতিকেই উৎসাহ দিয়েছে। তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, এবার রাজ্যে ডাবল ইঞ্জিন সরকার গঠিত হবে এবং যাদবপুর ও সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে উন্নয়ন নতুন গতি পাবে। এদিকে, বামফ্রন্ট এখানে প্রার্থী করেছে প্রবীণ আইনজীবী এবং কলকাতার প্রাক্তন মেয়র বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যকে। তিনি বিজেপি এবং তৃণমূল উভয়কেই নিশানা করে বলেন, এই দলগুলি ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি করছে এবং উন্নয়ন তাদের নীতিতেই নেই। তিনি বলেন, উভয় দলই জনগণকে বিভ্রান্ত করে ক্ষমতায় থাকতে চায়। তিনি যাদবপুরের বৌদ্ধিক পরম্পরার উল্লেখ করে বলেন, এবার এখানকার ভোটাররা বামফ্রন্টকে একটি শক্তিশালী বিকল্প শক্তি হিসেবে বেছে নেবেন।
সামগ্রিকভাবে, চলতি বিধানসভা নির্বাচনে যাদবপুর আসনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখানকার রাজনৈতিক লড়াই শুধু দলগুলোর মধ্যেই নয়, বরং আদর্শ, উন্নয়নের মডেল এবং শাসন পদ্ধতির মধ্যেও নিহিত। একদিকে তৃণমূল কংগ্রেস তার আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বিজেপি তার অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। আবার বামফ্রন্টও তার আধিপত্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় রয়েছে এবার। তবে জনতা জনার্দনের রায় জানতে অপেক্ষা ৪ মে।
---------------
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌম্যজিৎ