
আগরতলা, ২৬ এপ্রিল (হি.স.) : রাজধানী আগরতলায় কাটা খালের অববাহিকাকে ঘিরে উন্নয়নের পরিকল্পনা যেন মুহূর্তে অনিশ্চয়তার অন্ধকার নামিয়ে আনল শতাধিক পরিবারের জীবনে। অভয়নগর ব্রিজ সংলগ্ন ১১ ও ১২ নম্বর পুর ওয়ার্ডের প্রায় একশোর বেশি পরিবার—যাদের অনেকেই চার থেকে পাঁচ দশক ধরে এই মাটিকেই নিজের ঘর বলে জেনেছে—আজ হঠাৎই ‘অবৈধ দখলদার’ তকমায় উচ্ছেদের মুখে দাঁড়িয়ে।
সদর মহকুমা প্রশাসনের নোটিশ হাতে পাওয়ার পর থেকেই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন এই পরিবারগুলি। নোটিশে স্পষ্ট নির্দেশ—সরকারি খাস জমি ছেড়ে দিতে হবে। অথচ এই জমিতেই গড়ে উঠেছে তাদের স্বপ্ন, সংসার, স্মৃতি। কেউ সন্তান বড় করেছেন, কেউ ঘাম ঝরিয়ে ইটের পর ইট জুড়ে তুলেছেন পাকা বাড়ি। অনেকেই আবার প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার আওতায় সরকারি সহায়তা পেয়ে সেই স্বপ্নকে আরও মজবুত করেছেন। ১ লক্ষ ৬৬ হাজার টাকার সরকারি অনুদানের সঙ্গে নিজের সঞ্চয়, ঋণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে আজকের বাসস্থান।
কিন্তু এখন সেই ঘরই যেন পরিণত হয়েছে দুশ্চিন্তার কারণ।
“আমরা কোথায় যাব? মাথার ওপর ছাদটাই যদি কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে বাঁচব কীভাবে?”—চোখে জল নিয়ে এমন প্রশ্ন তুলছেন এক বাসিন্দা।
নোটিশ পাওয়ার পর আশার আলো খুঁজতে সদর মহকুমা শাসকের দ্বারস্থ হয়েছিলেন বাসিন্দারা। কিন্তু সেখান থেকেও মেলেনি কোনও স্পষ্ট আশ্বাস। প্রশাসনের তরফে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—নিয়ম অনুযায়ী উচ্ছেদ অনিবার্য। এই অবস্থায় ক্ষোভ আর অসহায়তার মিশ্র অনুভূতি নিয়ে রবিবার পথে নামেন তাঁরা।
অভয়নগর ব্রিজ সংলগ্ন রাস্তায় গড়ে ওঠে প্রতিবাদের মঞ্চ। নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ—সবাই মিলে রাস্তা অবরোধ করে বসেন। তাঁদের একটাই দাবি—উচ্ছেদের আগে বিকল্প বাসস্থানের নিশ্চয়তা দিতে হবে। না হলে আন্দোলন চলবে। “৪০-৪৫ বছর ধরে এখানে আছি। আজ হঠাৎ করে চলে যেতে বলছে। আমাদের কি কোনও অধিকার নেই?”—প্রতিবাদীদের কণ্ঠে স্পষ্ট ক্ষোভ।
এই অবরোধের জেরে দীর্ঘ সময়ের জন্য অচল হয়ে পড়ে শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, যা দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করেন, বিশেষ করে জিবিপি হাসপাতালের রোগী ও তাদের পরিবার। চরম ভোগান্তির শিকার হন সাধারণ মানুষ। তবুও আন্দোলনকারীদের অবস্থান অনড়—বিকল্প ছাড়া সরানো যাবে না।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান কর্পোরেটর হীরালাল দেবনাথ ও পুলিশ বাহিনী। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং আশ্বাস দেন যে বিষয়টি প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে তুলে ধরে সমাধানের চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি তিনি এও জানান, রাস্তা অবরোধ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
অবশেষে দীর্ঘ আলোচনার পর প্রশাসনিক আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেন বিক্ষোভকারীরা। তবে তাঁদের চোখে-মুখে স্পষ্ট—আশ্বাসে নয়, তাঁরা চাইছেন বাস্তব সমাধান।
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ