

গুয়াহাটি, ১৮ জুন (হি.স.) : আসন্ন অম্বুবাচি মহাযোগ ২০২৬-কে সুষ্ঠু ও নিরুপদ্রবভাবে সম্পন্ন করতে প্রস্তুত কামরূপ মেট্রোর সাধারণ এবং পুলিশ প্রশাসন। প্রতি বছরের মতো এবারও আগামী ২২ জুন থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় অম্বুবাচি মেলায় লক্ষাধিক ভক্ত-তীর্থযাত্রী এবং -সাধুসন্তের সমাগমের পরিপ্রেক্ষিতে কামরূপ মেট্রোর সাধারণ এবং পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতা তুঙ্গে। অম্বুবাচি উপলক্ষ্যে কামাখ্যা মন্দিরে আগত ভক্তদের নিরাপত্তা, সুষ্ঠু যাতায়াত এবং সামগ্রিক সুবিধা নিশ্চিত করতে বিস্তৃত প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করেছে কামরূপ মহানগর জেলা প্রশাসন।
আজ বৃহস্পতিবার কামাখ্যা মন্দির চত্বরে দলৈ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে কামরূপ মহানগর জেলাশাসক স্বপ্নীল পাল প্রশাসনিক প্রস্তুতির বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। সাংবাদিক সম্মেলনে আইজিপি (আইন-শৃঙ্খলা) অখিলেশ কুমার সিং, মন্দিরের দলৈবৃন্দ, ঊর্ধ্বতন অন্য প্রশাসনিক এবং পুলিশ আধিকারিররাও ছিলেন।
জেলাশাসক জানান, প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কামাখ্যা রেলওয়ে স্টেশন এবং পাণ্ডু বন্দরে তিনটি অস্থায়ী তীর্থযাত্রী শিবির স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি আগত ভক্তদের জন্য ভাণ্ডারা (বিনামূল্যে সমবায় ভোজন) পরিচালনার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট স্থানও বরাদ্দ করা হয়েছে।
তীর্থযাত্রীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য মালিগাঁওয়ের নার্সারি পয়েন্ট দিয়ে নীলাচল পাহাড়ে প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত করা হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নার্সারি পয়েন্ট থেকে মন্দির চত্বর পর্যন্ত চারটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ এবং সাতটি সহায়তা কেন্দ্র (হেল্প ডেস্ক) স্থাপন করা হবে, যাতে ভক্তদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা প্রদান করা যায়।
মেলার পুরো সময়জুড়ে নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা ও কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে সরকারি আধিকারিক ও কর্মচারীদের পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্বে মোতায়েন করা হবে।
জেলাশাসক জানান, উত্তরপূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব অম্বুবাচি মেলায় আগত বিপুল সংখ্যক তীর্থযাত্রীর জন্য নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং আধ্যাত্মিকভাবে সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করাই এই সমস্ত ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।
তিনি জানান, মন্দির চত্বর ও আশপাশ এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও স্যানিটেশনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রবীণ নাগরিক ও বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্যও বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে তাঁদের তীর্থযাত্রা নির্বিঘ্ন হয়।
জনস্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে মেলা চলাকালীন খাদ্যের গুণমান ও নিরাপত্তার মান পর্যবেক্ষণের জন্য খাদ্য পরিদর্শকদের মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে অম্বুবাচি মহাযোগ উপলক্ষ্যে বিস্তৃত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ঘোষণা করেছে গুয়াহাটি ট্রাফিক পুলিশ। তীর্থযাত্রী ও ভক্তদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা, পথচারী সহ ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা প্রদান এবং জরুরি পরিষেবার যানবাহনের নিরবচ্ছিন্ন চলাচল বজায় রাখার লক্ষ্যে অস্থায়ী ট্রাফিক বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়েছে।
গুয়াহাটির ট্রাফিক উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসিপি ট্রাফিক) এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানান, অম্বুবাচি মহাযোগ চলাকালীন নীলাচল পাহাড় ও সংলগ্ন এলাকায় বিপুল সংখ্যক ভক্ত এবং যানবাহনের চাপ সামাল দিতে বিশেষ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও যানবাহন ঘুরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে।
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, কামাখ্যার পাদদেশ থেকে মা কামাখ্যা মন্দিরমুখী রাস্তায় সব ধরনের সাধারণ যানবাহনের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে। তবে অ্যাম্বুলেন্স, দমকলের গাড়ি, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও অক্সিজেন সিলিন্ডার বহনকারী যানবাহন এবং পুরসভার জরুরি পরিষেবা গাড়িগুলিকে এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে। এছাড়া জল ও অন্যান্য অত্যাবশ্যক সামগ্রী বহনকারী যানবাহন রাত ১১টা থেকে ভোর ৫-টার মধ্যে মন্দিরমুখী চলাচল করতে পারবে।
এছাড়া জেলা প্রশাসনের জারিকৃত অনুমোদিত কার-পাসধারী যানবাহন এবং ফেরি কার ছাড়া অন্য কোনও গাড়িকে পাণ্ডু টেম্পল ঘাট থেকে বংশীবাগান হয়ে মা কামাখ্যা মন্দির পর্যন্ত চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। উৎসবের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি কর্মী ও কর্মকর্তারা সোনারাম উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে সমবেত হবেন এবং প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় ফেরি পরিষেবার মাধ্যমে নির্ধারিত কর্মস্থলে পৌঁছাবেন।
বিভিন্ন দিক থেকে আগত ভক্তদের জন্য বিশেষ নামানোর স্থান বা ড্রপ-অফ পয়েন্ট ও পার্কিং ব্যবস্থাও নির্ধারণ করা হয়েছে। জালুকবাড়ি ও ভরলুমুখের দিক থেকে আগত যানবাহন নীলাচল ফ্লাইওভারের নিকটবর্তী নির্ধারিত সার্ভিস লেনে যাত্রী নামিয়ে আদাবাড়ি বাসস্ট্যান্ড ও বড়িপাড়া মাঠে নির্ধারিত পার্কিং স্থানে যাবে।
গণপরিবহণ ব্যবস্থাও সংশোধিত নিয়মে পরিচালিত হবে। এএসটিসি বাস, সিটি বাস এবং বেসরকারি যানবাহন প্রধানত নীলাচল ফ্লাইওভার ব্যবহার করবে। তবে সিটি বাসগুলিকে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট স্টপেজে যাত্রী নামানোর অনুমতি দেওয়া হবে, ফ্লাইওভারের দুই প্রান্তে যাত্রী নামানো যাবে না।
মা কামাখ্যা মন্দিরে আগত ভক্তদের জন্য মোটরসাইকেল, হালকা মোটরযান ও ভারী যানবাহনের পার্কিংয়ের উদ্দেশ্যে আদাবাড়ি বাসস্ট্যান্ড, বড়িপাড়া মাঠ, আইটিএ মাছখোয়া, এএসটিসি পার্কিং মাছখোয়া এবং ইদগাহ মাঠ মাছখোয়াকে নির্ধারিত পার্কিং এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মেলা চলাকালীন প্রতিদিন সকাল ৫-টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ডিজি রোড, এমজি রোড, এটি রোড, পাণ্ডু পোর্ট রোড এবং বড়বাজার রোড সহ শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বাণিজ্যিক পণ্যবাহী যানবাহন ও ধীরগতির যান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাস, এএসটিসি পরিষেবা সহ শহরের নির্দিষ্ট অংশে প্রবেশ করতে পারবে না। তবে কামাখ্যা রেলওয়ে জংশন থেকে আগত তীর্থযাত্রীবাহী বাসগুলিকে বিশেষ রুটে পাণ্ডু বন্দরের অস্থায়ী শিবির পর্যন্ত চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে।
এছাড়া ২৭ নম্বর জাতীয় সড়ক থেকে তেতেলিয়া হয়ে গোশালা অভিমুখে যাতায়াতকারী ভারী যানবাহনের ওপরও বিধিনিষেধ থাকবে। সম্ভাব্য যানজটের কথা বিবেচনা করে লোকপ্রিয় গোপীনাথ বরদলৈ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাতায়াতকারী যাত্রীদের আগেভাগে যাত্রার পরিকল্পনা করা এবং সম্ভব হলে ২৭ নম্বর জাতীয় সড়ক করিডর ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নীলাচল ফ্লাইওভারের নিচের পুরো অংশকে সংরক্ষিত পার্কিং জোন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পাণ্ডু পোর্ট রোড, বড়বাজার রোড, ডিজি রোড, ভরলুমুখের এলিভেটেড করিডর এবং নীলাচল ফ্লাইওভারের বিভিন্ন অংশে রাস্তার ধারে পার্কিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাতে যান চলাচল নির্বিঘ্ন থাকে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহরবাসী, যাত্রী এবং আগত ভক্তদের ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে এবং ঘোষিত নির্দেশিকা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে অম্বুবাচি মহাযোগ ২০২৬ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা যায়।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস