
বাঁকুড়া, ২৭ জুন (হি.স.) : প্রভাব খাটিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি দখল করে তিনতলা বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে বাঁকুড়ার রানিবাঁধের তৃণমূল নেতা গৌর টুডু এবং তাঁর স্ত্রী, জেলা পরিষদের সদস্যা বিভাবতী টুডুর বিরুদ্ধে। প্রশাসনের তরফে সরকারি জমি খালি করার নোটিস জারি হতেই এলাকা ছেড়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন ওই দম্পতি বলে জানা গিয়েছে। ঘটনাকে ঘিরে শনিবার এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ, ২০১৬ সালে রানিবাঁধ নিম্ন বুনিয়াদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ১২ শতক সরকারি জমি দখল করে সেখানে তিনতলা বাড়ি নির্মাণ করেন গৌর টুডু। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় স্তরে অভিযোগ উঠলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রশাসনিক কোনও পদক্ষেপ হয়নি বলে দাবি এলাকাবাসীর।
রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। গত ১৬ জুন রানিবাঁধ ব্লকের বিডিও গৌর টুডুকে নোটিস পাঠিয়ে জমির মালিকানার বৈধ নথি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ২২ জুন তিনি ব্লক ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরে কিছু নথি জমা দিলেও তদন্তে জমির বৈধ মালিকানা প্রমাণ করতে পারেননি বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে।
এরপর ২৩ জুন প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্বিতীয় নোটিস জারি করে সাত দিনের মধ্যে সরকারি জমির উপর নির্মিত বাড়ি খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। নোটিসে জানানো হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাড়ি খালি না করা হলে প্রশাসন নিজেই নির্মাণ ভেঙে সরকারি জমি পুনরুদ্ধার করে তা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হাতে ফিরিয়ে দেবে। ওই নোটিস জারির পর থেকেই গৌর টুডু ও বিভাবতী টুডু এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
সরকারি জমি পুনরুদ্ধারে প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, অভিভাবক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, বহু বছর ধরে বিদ্যালয়ের জমি দখল হয়ে থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কেউ মুখ খোলার সাহস পাননি।
প্রসঙ্গত, গৌর টুডু রানিবাঁধ তথা জঙ্গলমহলের প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা হিসেবে পরিচিত। পেশায় তিনি একজন প্রাথমিক শিক্ষক। তিনি রানিবাঁধ ব্লক তৃণমূল কংগ্রেসের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি একসময় দলের তফসিলি জনজাতি শাখার জেলা স্তরের দায়িত্বেও ছিলেন।
অন্যদিকে, তাঁর স্ত্রী বিভাবতী টুডুও পেশায় প্রাথমিক শিক্ষিকা। ২০১৩ সাল থেকে টানা তৃণমূলের টিকিটে বাঁকুড়া জেলা পরিষদের সদস্যা নির্বাচিত হয়ে আসছেন। জেলা পরিষদ বামেদের দখলে থাকাকালীন তিনি বিরোধী দলনেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে জেলা পরিষদের সহ-সভাধিপতির পদেও ছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ওই দম্পতির যথেষ্ট রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। ফলে সরকারি জমি দখলের অভিযোগ সম্পর্কে সকলেই জানলেও ভয়ে প্রকাশ্যে কেউ অভিযোগ করতে পারেননি। এমনকি প্রশাসনের একাংশও এতদিন কার্যত নীরব ছিল বলে তাঁদের দাবি।
এদিকে, স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য, সরকারি জমিতে বৈধ পাট্টা ছাড়া কোনও নির্মাণ করা যায় না। প্রশাসন যদি তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়, সে বিষয়ে দলের কিছু বলার নেই। আইন আইনের পথেই চলবে।
উল্লেখ্য, গৌর টুডু ও বিভাবতী টুডুর বিরুদ্ধে সরকারি জমি দখলের অভিযোগ এই প্রথম নয়। স্থানীয়দের দাবি, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসেও বন দফতরের কোয়ার্টার ভেঙে বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ উঠেছিল তাঁদের বিরুদ্ধে। কিন্তু তখনও কোনও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা।
হিন্দুস্থান সমাচার / সোমনাথ বরাট