
মোহনপুর (ত্রিপুরা), ৩০ জুলাই (হি.স.) : মঙ্গলবার ছিল বাড়িজুড়ে উৎসবের আবহ। একমাত্র আদরের মেয়ে এলিজা দেববর্মার প্রথম জন্মদিন ঘিরে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীদের উপস্থিতিতে আনন্দে মেতে উঠেছিল গোটা পরিবার। বাড়ি তখনও রঙিন বেলুন, ফিতে আর জন্মদিনের সাজে সেজে ছিল। কিন্তু সেই আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই বুধবার দুপুরে নেমে এল অকল্পনীয় এক শোকের ছায়া। প্রথম জন্মদিনের মাত্র একদিন পরই সবার অজান্তে বিষাক্ত শামুক মুখে দিয়ে প্রাণ হারাল এক বছর একদিন বয়সী শিশুকন্যা এলিজা দেববর্মা। হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে সিধাই মোহনপুরের চন্দ্রমণিপাড়া এলাকায়।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, বুধবার দুপুরে এলিজার মা তাঁকে স্নান করিয়ে নিজে স্নান করতে যান। এ সময় শিশুটি ঘরের মধ্যেই খেলছিল। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির কারণে আশপাশের ঝোপঝাড় থেকে কয়েকটি শামুক বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেয়াল বেয়ে উঠছিল। পরিবারের কেউ বুঝতেই পারেননি যে ওই শামুকগুলির মধ্যে বিষাক্ত শামুকও ছিল। খেলতে খেলতেই ছোট্ট এলিজা একটি শামুক মুখে নিয়ে গিলে ফেলে।
কিছুক্ষণ পর থেকেই শিশুটি অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে এবং বারবার ঢেকুর দিতে থাকে। বিষয়টি প্রথমে পরিবারের সদস্যদের কাছে তেমন গুরুতর বলে মনে হয়নি। এরই মধ্যে স্নান সেরে এসে এলিজার মা তাঁকে ভাত খাওয়ানোর জন্য কোলে নেন। হঠাৎ করেই শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে মায়ের কোলেই লুটিয়ে পড়ে।
আতঙ্কিত পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকরা দ্রুত আগরতলায় জিবিপি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। কিন্তু সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে জিবিপি হাসপাতালে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই চিকিৎসকদের সামনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ছোট্ট এলিজা দেববর্মা।
প্রথম জন্মদিনের কেক কাটার হাসি মুহূর্তেই পরিণত হয় বুকফাটা কান্নায়। যে বাড়িতে একদিন আগেও শিশুর হাসি আর শুভেচ্ছার কোলাহল ছিল, সেখানে এখন শুধুই শোক আর আহাজারি। আদরের সন্তানকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন এলিজা দেববর্মার বাবা-মা। বৃহস্পতিবার জিবিপি হাসপাতালে নিয়ম মেনে শিশুটির দেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। হাসপাতালের মর্গের সামনে শোকাহত পিতা ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ময়নাতদন্ত শেষে এলিজা দেববর্মার নিথর দেহ চন্দ্রমণিপাড়ার নিজ বাড়িতে নিয়ে আসা হলে হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শেষবারের মতো শিশুকে দেখতে ভিড় জমান আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা। চারদিকে কান্নার রোল পড়ে যায়। অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় গোটা চন্দ্রমণিপাড়া এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মাত্র একদিন আগে যে শিশুকে আশীর্বাদে ভরিয়ে দিয়েছিলেন সকলে, আজ তাঁকেই শেষ বিদায় জানাতে হলো। আনন্দ আর শোকের এই নির্মম ব্যবধান যেন স্তব্ধ করে দিয়েছে সমগ্র এলাকাকে।
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ