
ঝাড়গ্রাম, ১২ আগস্ট (হি. স.): শ্রাবণের অমাবস্যা, স্থানীয় ভাষায় ‘উঁয়াস’। আর এই তিথিকে ঘিরেই বুধবার উৎসবের আবহে মেতে উঠল সুবর্ণরৈখিক অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকা। কৃষিজীবন, লোকবিশ্বাস এবং আঞ্চলিক খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা ‘চিতো উঁয়াস’ উপলক্ষে এদিন ঘরে ঘরে তৈরি হল চিতো পিঠে। কোথাও দুধ ও গুড়ের সঙ্গে, আবার কোথাও মাংসের সঙ্গে এই পিঠে খাওয়ার রীতি রয়েছে। চিতো উঁয়াসকে ঘিরে ‘অরন্ধন’ ও উনুন পুজোর মতো নানা প্রাচীন লোকাচারও পালিত হয়।
একসময় শ্রাবণের এই সময়ের মধ্যে চাষের গুরুত্বপূর্ণ কাজ অনেকটাই শেষ হয়ে আসত। তাই কৃষকের পরিশ্রমের পর কিছুটা আনন্দ, খাওয়াদাওয়া ও পারিবারিক মিলনমেলার উপলক্ষ হিসাবেও এই পরবের বিশেষ গুরুত্ব ছিল।
সুবর্ণরৈখিক ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার সংগঠন ‘আমারকার ভাষা আমারকার গর্ব’-এর মুখ্য সঞ্চালক বিশ্বজিৎ পাল বলেন, “চিতো উঁয়াস শুধুমাত্র একটি উৎসব নয়। এর সঙ্গে আমাদের কৃষিজীবন, খাদ্যাভ্যাস, লোকবিশ্বাস এবং আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির বহু স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। সব মিলিয়ে এটি সুবর্ণরৈখিক এলাকার নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”
অরন্ধনের রীতির সঙ্গেও রয়েছে পুরনো খাদ্যসংস্কৃতির যোগ। আগের দিনের পান্তাভাত, শাক-সব্জি, বিশেষ করে সজনে শাক ছিল এই সময়ের পরিচিত খাবার। সময়ের সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এলেও সেই পুরনো রীতির স্মৃতি এখনও ধরে রেখেছেন বহু পরিবার।
চিতো উঁয়াসের আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের বার্তা। পরিবারের সদস্যদের খাওয়ানোর আগে চিতো পিঠের ছোট ছোট অংশ বাড়ির বাইরে সাপ, ব্যাঙ, শামুক, কুচিয়ার নামে ছড়িয়ে দেওয়ার রীতি রয়েছে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এতে জমিতে কাজ করতে যাওয়া পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষা কামনা করা হয়। একই সঙ্গে প্রকৃতির অন্যান্য জীবের প্রতিও শ্রদ্ধা জানানোর ভাবনাও এর মধ্যে রয়েছে।
বিশ্বজিৎ পাল বলেন, “উৎসবের খাবার প্রকৃতির জীবজন্তুর সঙ্গেও ভাগ করে নেওয়ার এই রীতির মধ্যে আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে থাকার দর্শন ফুটে ওঠে।”
ছাতিনাশোলের প্রবীণা অম্বিকা রাউত জানান, মঙ্গলবার রাত থেকেই বাড়িতে চিতো পিঠে তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। তাঁর কথায়, “এই সময় আত্মীয়-পরিজনেরাও বাড়িতে আসেন। মেয়েরাও শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে আসে। ফলে কয়েক দিন ধরেই বাড়িতে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়।”
চিতো উঁয়াসের পর থেকেই সুবর্ণরৈখিক এলাকায় শুরু হয়ে যায় পরপর লোকউৎসবের পালা। প্রচলিত ছড়াতেও রয়েছে সেই ইঙ্গিত—‘আইলা রে চিতো রানি, সব পরবের বার্তা ঘিনি।’ এরপর পূর্ণিমায় গমহা পুনেই, তারপর জন্মাষ্টমী, রাধাষ্টমী, জিতাষ্টমী এবং দুর্গাষ্টমী। তাই চিতো উঁয়াস কেবল একটি তিথির নাম নয়, বরং সুবর্ণরৈখিক এলাকার দীর্ঘ লোকউৎসবের ধারারও যেন সূচনা।
হিন্দুস্থান সমাচার / গোপেশ মাহাতো